খুঁজুন
, ,

চরভদ্রাসনে চায়না দুয়ারীতে আটকা বিপন্ন মেছো বাঘ, উদ্ধার করল বন বিভাগ

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৩ অপরাহ্ণ
চরভদ্রাসনে চায়না দুয়ারীতে আটকা বিপন্ন মেছো বাঘ, উদ্ধার করল বন বিভাগ

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার একটি মাছ ধরার চায়না দুয়ারীতে আটকা পড়েছে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির একটি মেছো বাঘ (Fishing Cat)।

বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে উপজেলার চর হরিরামপুর ইউনিয়নের শালেপুর সার্ভিস ঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাণীটিকে উদ্ধার করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শালেপুর গ্রামের বাসিন্দা একলাছ ব্যাপারী সকালে ডাঙায় ফেলে রাখা নিজের মাছ ধরার চায়না দুয়ারী দেখতে গিয়ে সেটির ভেতরে একটি অজানা বন্য প্রাণী আটকা পড়ে থাকতে দেখেন। প্রথমে তিনি ও আশপাশের লোকজন এটিকে বাঘের শাবক বলে মনে করেন। পরে একলাছ ব্যাপারী ও তার ভাই লুৎফর ব্যাপারী প্রাণীটিকে সার্ভিস ঘাট এলাকায় এনে নিরাপদে বেঁধে রাখেন এবং বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগকে জানান।

তবে প্রাণীটিকে উদ্ধার করার সময় মেছো বাঘটির নখের আঁচড়ে আহত হন একলাছ ব্যাপারী ও তার ভাই লুৎফর ব্যাপারী। পরে তারা চরভদ্রাসন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চিকিৎসা নেন। আহত দুই ভাই উপজেলার মধ্যচর শালেপুর গ্রামের জালাল ব্যাপারীর ছেলে।

খবর পেয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাণীটিকে উদ্ধার করেন। উপজেলা বন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ফজলে করিম ডিউক জানান, উদ্ধার হওয়া প্রাণীটি একটি বিপন্ন প্রজাতির মেছো বাঘ। প্রাথমিকভাবে এটিকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের জন্য প্রাণীটিকে জেলা সামাজিক বন বিভাগে পাঠানো হবে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ আবাসস্থলে অবমুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, মেছো বাঘ সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না। এটি জলাভূমি, বিল-ঝিল ও নদী-খালসংলগ্ন এলাকায় বসবাস করে এবং মাছ, ইঁদুর, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও ছোট পাখি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্থানীয়দের অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো মেছো বাঘ দেখে ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বন্য প্রাণী দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে বা ক্ষতি না করে দ্রুত বন বিভাগ কিংবা স্থানীয় প্রশাসনকে খবর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, আবাসস্থল ধ্বংস, জলাভূমি সংকুচিত হওয়া এবং অবৈধ শিকারের কারণে দেশে মেছো বাঘের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। তাই এ ধরনের বিরল বন্য প্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।

সালথায় ছাত্রদলের ১৫ সদস্যের কমিটিতে ৪ নেতা বিবাহিত, দু’জনের রয়েছে সন্তানও

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪৩ অপরাহ্ণ
সালথায় ছাত্রদলের ১৫ সদস্যের কমিটিতে ৪ নেতা বিবাহিত, দু’জনের রয়েছে সন্তানও

ফরিদপুরের সালথা উপজেলা ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত ১৫ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কমিটির চারজন নেতা বিবাহিত এবং তাদের মধ্যে দু’জনের সন্তান রয়েছে—এমন তথ্য সামনে আসার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন, তৃণমূল নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

গত ২২ জুন ফরিদপুর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সৈয়দ আদনান হোসেন অনু এবং সাধারণ সম্পাদক তানজিমুল হাসান কায়েস স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সালথা উপজেলা ছাত্রদলের ১৫ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে রেজাউল ইসলাম (রাজ)কে সভাপতি এবং সোহেল মাতুব্বরকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কমিটির সাধারণ সম্পাদক সোহেল মাতুব্বর, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তানভীর হোসেন, সিনিয়র সহ-সভাপতি সাব্বির আহমেদ রাকিব এবং সহ-সভাপতি মো. রাজীব হোসেন—এই চারজনই বিবাহিত।

তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ সম্পাদক সোহেল মাতুব্বরের গ্রামের বাড়ি উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের খালিশপট্টি গ্রামে। তিনি ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর প্রেমের সম্পর্কের পর মধুখালী উপজেলার বেলেশ্বর রামকান্তপুর গ্রামের সুরাইয়া সুলতানাকে বিয়ে করেন। পরে দাম্পত্য কলহের জেরে দেনমোহর ও ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলা হয় এবং তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। বর্তমানে তিনি পুনরায় বিয়ে করে সংসার করছেন বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তানভীর হোসেন ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পারিবারিকভাবে ফরিদপুর সদর উপজেলার হাটগোবিন্দপুর গ্রামের আবিদাকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে একটি পুত্র সন্তান রয়েছে।

সিনিয়র সহ-সভাপতি সাব্বির আহমেদ রাকিব প্রায় চার বছর আগে মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মুরাটিয়া গ্রামের এক নারীকে সামাজিকভাবে বিয়ে করেন। তাদের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। এছাড়া সহ-সভাপতি মো. রাজীব হোসেনও উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের লক্ষণদিয়া গ্রামের এক নারীর সঙ্গে সামাজিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসার করছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে বিবাহিত নেতাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ এটিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্বে ছাত্র পরিচয় ও সাংগঠনিক নীতিমালার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এ বিষয়ে সালথা উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সোহেল মাতুব্বর বলেন, “আগে বিবাহিতদের নিয়ে কিছু জটিলতা থাকলেও বর্তমানে এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমাদের কমিটি সম্পর্কে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অবগত আছেন। তাই এ নিয়ে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”

অন্যদিকে, সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার বলেন, “কমিটি গঠনের আগে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। পরে জানতে পারি, কমিটির চারজন নেতা বিবাহিত এবং দু’জনের সন্তানও রয়েছে। আমার মতে, এটি ছাত্রদলের গঠনতন্ত্রের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে যোগ্য ও সক্রিয় ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠন করা উচিত।”

ফরিদপুরে চাঁদা না দেওয়ায় সরকারি কর্মকর্তার বাড়ি থেকে ৮ হাজার ইট লুট, প্রাণনাশের হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৫:৫৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে চাঁদা না দেওয়ায় সরকারি কর্মকর্তার বাড়ি থেকে ৮ হাজার ইট লুট, প্রাণনাশের হুমকি

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি, প্রাণনাশের হুমকি এবং এক সরকারি কর্মকর্তার বাড়ি থেকে প্রায় ৮ হাজার ইট জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী কর্মকর্তা।

বুধবার (১৫ জুলাই) ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি বরাবর দেওয়া এক লিখিত আবেদনে এসব অভিযোগ করেন মো. হায়দার হোসেন। আবেদনের অনুলিপি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছেও পাঠানো হয়েছে।

মো. হায়দার হোসেন বর্তমানে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)-এর অধীনে সাতক্ষীরা জেলার তালা আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অডিও ভিজ্যুয়াল কর্মকর্তা (এভিও) হিসেবে কর্মরত। তার গ্রামের বাড়ি বোয়ালমারী উপজেলার ময়েনদিয়া গ্রামে।

লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি চাকরির কারণে কর্মস্থল সাতক্ষীরায় হলেও গত প্রায় এক বছর ধরে নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি নিজ বাড়িতে যেতে পারছেন না। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে দেখা-সাক্ষাৎ করাও তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

হায়দার হোসেন আরও অভিযোগ করেন, গত ১৬ জুন ২০২৬ চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের নেতৃত্বে স্থানীয় সিমেন্ট ব্যবসায়ী মো. হাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন তার বাড়িতে গিয়ে জোরপূর্বক প্রায় ৮ হাজার ইট নিয়ে যান।অভিযোগের সত্যতা প্রমাণে তিনি ঘটনার আলামত হিসেবে কয়েকটি ছবিও সংযুক্ত করেছেন।

অভিযোগে তিনি আরও উল্লেখ করেন, আব্দুল মান্নান মাতুব্বর পূর্বে পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং তার ছোট ভাই মো. সিদ্দিক মাতুব্বর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা বিএনপিতে যোগ দেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

সরকারি এই কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভয়ভীতি, হুমকি ও প্রভাব বিস্তারের কারণে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও নিজের বাড়িতে যেতে না পারা এবং পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে না পারার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মাতুব্বর। তিনি বলেন, “এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি ইট লুট করেছি—এটি প্রমাণ করতে পারলে ইটের ক্ষতিপূরণসহ ফেরত দেব। বরং আমি তাদের কাছেই টাকা পাব। চাঁদা দাবির প্রশ্নই ওঠে না। এছাড়া আমি কখনোই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম না। সরকারি ওই কর্মকর্তাকে বাড়িতে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও সম্পূর্ণ মিথ্যা।”

এ বিষয়ে বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এ ঘটনায় এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. রকিবুল হাসান বলেন, “ওই ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলা থাকায় তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তার স্থলে ইউনিয়নের ১ নম্বর প্যানেল সদস্যকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তার অভিযোগটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

‘সিমতি’কে মনে পড়ে’

সোহানুর রহমান
প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ
‘সিমতি’কে মনে পড়ে’

প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা। আষাঢ়ের এক বৃষ্টিভেজা দিনে অকারণেই গিয়েছিলাম ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার একটি বাড়িতে। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি, আর ভেতরে ধোঁয়া ওঠা রং চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্পে মেতে উঠেছিলাম।

হঠাৎ চোখ পড়ল ঘরের আলমারির দিকে। দেখি, একটি ছোট্ট ইঁদুরের বাচ্চা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি গন্ধের ব্যাপারে একটু সংবেদনশীল। শুরু থেকেই ইঁদুরের বিষ্ঠার গন্ধে অস্বস্তি লাগছিল। তাই বাড়ির কর্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “ইঁদুরের এত উৎপাত কেন?”

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এর পেছনে আছে সিমতির গল্প।”

সিমতি—হালকা-পাতলা, ছিপছিপে গড়নের সাদা-কালো ডোরাকাটা একটি মেয়ে বিড়াল। খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। মাঝে মাঝে রান্নাঘর থেকে মাছ চুরি করত, কখনো বিছানায় প্রসাবও করে ফেলত। তবে একটি ব্যাপারে সে ছিল ব্যতিক্রম—অজায়গায় কখনো বিষ্ঠা ত্যাগ করত না। আর ইঁদুর দেখলে তো কথাই নেই; মুহূর্তেই শিকার ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়ত।

একদিন পাশের বাড়ির একটি বিড়ালছানার সঙ্গে খেলতে গিয়ে খামচি কেটে দেয় সিমতি। এতে বিরক্ত হয়ে বাড়ির কর্তা তার ধারালো নখ কেটে দেন। শুধু তাই নয়, পাথর দিয়ে ঘষে তার সূচালো দাঁতও ভোঁতা করে দেন।

সেদিনের পর থেকেই যেন সিমতি আর আগের সিমতি রইল না।

নখ-দাঁতহীন সিমতি আর পাশের বাড়ির বিড়ালছানার সঙ্গে খেলতে যায় না। বাড়ির সামনে আকাশছোঁয়া শিমুল গাছে আর উঠে না। ইঁদুরের উপস্থিতি টের পেলেও আর শিকারের প্রস্তুতি নেয় না। সারাদিন রান্নাঘরের চুলার পাশে শুয়ে-বসে শুধু ম্যাও ম্যাও করে।

বাড়ির কর্তা একদিন জোর করে তাকে একটি ইঁদুরের সামনে এনে বসিয়েছিলেন। কিন্তু ইঁদুর শিকার করা তো দূরের কথা, ইঁদুরের ভয়ে সিমতিই দৌড়ে পালিয়ে গেল!

একসময় যে বাড়িতে ইঁদুরের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, সেখানে এখন যেন ইঁদুরের রাজত্ব। খাবার টেবিলে ইঁদুর, সোফার নিচে ইঁদুর, আলমারির ভেতর ইঁদুর—চারদিকে শুধু ইঁদুর আর ইঁদুর।

বাড়ির কর্তা আক্ষেপ করে বললেন, “এখন বুঝি, কী ভুলটাই না করেছি! কেন যে সিমতির নখ কেটে দিলাম, দাঁত ঘষে ভোঁতা করে দিলাম!”

আমি বললাম, “তাহলে নতুন একটা বিড়াল আনুন।”

তিনি মৃদু হেসে বললেন,“নতুন বিড়াল এনে কী হবে? ইঁদুরগুলোর তো এখন অভ্যাস হয়ে গেছে বিড়ালকে তাড়া করার, বিড়ালকে নিয়ে খেলা করার, এমনকি বিড়ালের মুখের ওপরই হাগু করার!”

কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলাম।

ঠিক তখনই বাইরে মোটরসাইকেলের হর্ন শোনা গেল। একই সঙ্গে ভেসে এল কারও কণ্ঠস্বর—“হ… হ… পুলিশকে আরও দুর্বল কর। তারপর শান্তিতে বসবাস কইরা দেইখো!”

জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, হালকা করে চুল ছাঁটা, পেটমোটা এক ব্যক্তি মোটরসাইকেল চালিয়ে দূরে মিলিয়ে গেল।

এরই মধ্যে বৃষ্টিও থেমে গেছে। বাড়ির কর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি ফরিদপুরের উদ্দেশে রওনা হলাম।

কিন্তু আজও মাঝে মাঝে সিমতির কথা মনে পড়ে। মনে হয়, যার নখ-দাঁত কেটে তাকে অসহায় করে দেওয়া হয়, সে শুধু নিজের শক্তিই হারায় না—তার সঙ্গে হারিয়ে যায় চারপাশের স্বাভাবিক ভারসাম্যও।

লেখক: পুলিশ কর্মকর্তা