খুঁজুন
শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

‘ভালো মানুষদের বিভক্তির দর্শন’

সৈয়দ হৃদয়
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
‘ভালো মানুষদের বিভক্তির দর্শন’

রাতের অনন্ত মহাকাশে যদি কোটি কোটি নক্ষত্র একে অপরকে উপেক্ষা করে কেবল নিজ নিজ কক্ষপথে পাথরের মতো অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, তবে সেই বিশালতা আর মহাবিশ্ব থাকতো না; তা পরিণত হতো প্রাণহীন নিথর রঙ্গমঞ্চে। সেখানে আলোর অস্তিত্ব হয়তো থাকতো, কিন্তু থাকতো না কোনো মহাজাগতিক সংগীতের সেই মায়াবী লহরী কিংবা প্রাণের গূঢ় সংলাপ। প্রতিটি তারা তার স্বমহিমায় জ্বলে ঠিকই, কিন্তু তাদের বিচ্ছিন্ন উজ্জ্বলতা কোনো জ্যোতির্বলয় সৃষ্টি করে না।

মানুষের সমাজতত্ত্বও এই মহাজাগতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে নয়। যাদের হৃদয়ে স্নিগ্ধ মমতা, চোখে আগামীর স্বপ্ন, কণ্ঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠ এবং আত্মায় ন্যায়ের শাশ্বত ধ্রুবতারা প্রদীপ্ত; তারা যখন আদর্শিক সূক্ষ্মতা বা মতভেদের প্রাচীরে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন সমাজের আকাশটিও হয়ে যায় বিষণ্ণ, নিস্পৃহ এবং নিস্তব্ধ।

ভালো মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা কোনো সাধারণ ফাটল নয়; এ এক নিঃশব্দ মহাপ্রলয়, যা অন্তরমিনারের ভিত্তিকে উপড়ে ফেলে মানবতার শেকড়কে নড়বড়ে করে দেয়। এই বিভক্তিকে বলা যায় এক প্রকার ‘অস্তিত্ববাদী শীতলতা’, যেখানে আলো হয়তো চোখে পড়ে, কিন্তু তাতে কোনো উত্তাপ নেই; গতি দৃশ্যমান, কিন্তু নেই কোনো ধ্রুব গন্তব্য।

এই বাস্তবতার প্রতিধ্বনি আমরা ইতিহাসের কণ্ঠেও শুনতে পাই। “বিশ্বে শয়তানের জয়ের জন্য মন্দের আস্ফালন যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী ভালো মানুষের রহস্যময় নীরবতা” মার্টিন লুথার কিং এর এই আক্ষেপিত উপলব্ধি ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতায় বারবার ধ্রুবসত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।

এই নীরবতার মূলে রয়েছে ভালো মানুষের পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় কথা সত্য, কিন্তু চিন্তার সূক্ষ্ম পার্থক্য, দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা আর নীতির প্রশ্নে অনমনীয় দৃঢ়তা তাদের মাঝে এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর তুলে দেয়। অথচ সেই প্রাচীরের ওপারে অন্যায়কারীরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজেদের স্বার্থের টানে একীভূত এবং সুসংগঠিত।

দুঃখজনক সত্য হলো, মন্দের শক্তি চিরকালই একরৈখিক এবং তাদের লোলুপ লালসা একবিন্দুতে মিলিত। বিপরীতে, ন্যায়ের ভাষা চিরকালই বহুমাত্রিক; কারো কাছে তা মানবিকতা, কারো কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ, কারো কাছে মুক্তি, আবার কারো কাছে তা কেবলই প্রতিরোধ।

ফলে ভালো মানুষেরা সত্যের শাশ্বত ভিত্তিতে একত্রিত হওয়ার বদলে সত্যের নিজস্ব ‘ব্যাখ্যা’ নিয়েই নিরন্তর সংঘাত ও তর্কে লিপ্ত হয়। তারা ভুলে যায়, সত্যকে কেবল অন্তরে লালন করলেই হয় না, তাকে বিজয়ী করতে শাণিত সততার পাশাপাশি সমন্বিত ঐক্যের রণকৌশলও অপরিহার্য।

এই সংকটের গভীরে নিহিত রয়েছে বাস্তবতাকে দেখার একপাক্ষিক সীমাবদ্ধতা। ফ্রানৎস কাফফা বলেছেন, “In the fight between you and the world, back the world.” অর্থাৎ, নিজের ক্ষুদ্র আদর্শিক আমিত্বের চেয়ে বাস্তবতার বিশালতাকে স্বীকার করে নাও।

ভালো মানুষেরা অনেক সময় স্বীয় আদর্শের শিখরে এতটাই সমাহিত থাকেন যে, পায়ের তলার মাটি, আর পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপটকে প্রায়ই উপেক্ষা করে বসেন। আদর্শের গগনচুম্বী পাহাড়ে বসে থাকতে গিয়ে তারা হারিয়ে ফেলেন সহমর্মিতার উদার সমুদ্র।

এই বিভাজন শুধু রাজনৈতিক, কিংবা সামাজিক নয়, এটি গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতা। তারা সবসময় একে অপরের মাঝে নিজের অবিকল প্রতিবিম্ব খোঁজেন; আর যখনই সেই প্রতিবিম্বের সামান্য বিচ্যুতি ঘটে, তখনই জন্ম নেয় সংশয়।

এই সন্দেহ ধীরে ধীরে ভালোবাসাকে গ্রাস করে, বিশ্বাসের ভূমি ক্ষয় করে এবং সংলাপের পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফলত, তারা একে অপরের পরিপূরক না হয়ে, হয়ে ওঠে কঠোর সমালোচক; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে একে অন্যের যাত্রাপথের প্রতিবন্ধকও।

এই সংকীর্ণতাই পরিণত হয় এক ধরনের আত্মমগ্নতায়।
তারা নিজেদের চিন্তার বিশুদ্ধতায় এতটাই ডুবে থাকেন যে, অন্যের চিন্তার ভিন্নতা দেখে আতঙ্কিত হয়। তারা ভাবে ‘আমার’ ন্যায়বোধ শুদ্ধ, ‘অন্যের’ নয় —এই আত্মবিশ্বাস চিন্তার দৃষ্টিকে সংকীর্ণ করে তোলে। অনেক সময় সত্যকে টুকরো খণ্ডিতও করে ফেলে।

এই খণ্ডিত বোধ থেকেই জন্ম নেয় পারস্পরিক প্রশ্ন, সন্দেহ, এমনকি অস্বীকৃতি। তখন দেখা যায়, দুর্নীতিবিরোধী একজন সমাজকর্মী নারী অধিকারকর্মীর অবস্থানকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেন না; নারী অধিকারকর্মী সমাজসংস্কারকের ভাষাকে কঠোর বা অগ্রহণযোগ্য মনে করেন; কবি যুক্তিবাদী চিন্তাকে শুষ্ক বলে প্রত্যাখ্যান করেন। অথচ তাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য এক, আর তা হলো, মানুষের কল্যাণ, সমাজের উন্নতি। তবুও তারা একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর বদলে, অদৃশ্য দূরত্বে অবস্থান নেন।

এ যেন এক মানসিক মধ্যাকর্ষণ, যেখানে সকল নক্ষত্র নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তিত হলেও কেউ কারো হাত ধরে নীহারিকা হয়ে ওঠে না।

এর পেছনে আরেকটি সূক্ষ্ম কারণ কাজ করে, আর তা হলো, প্রক্রিয়া বনাম ফলাফলের দ্বন্দ্ব। ভালো মানুষেরা জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেন ‘প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা’ নিয়ে। পক্ষান্তরে মন্দ শক্তিরা সবসময়ই ‘ফলাফল’ বা প্রভাবের দিকে মনোযোগী। তাই তারা লক্ষ্য অর্জনের পথে ব্যক্তিগত মতপার্থক্যকে গুরুত্ব দেয় না; বরং তা আড়াল করে রাখে বৃহত্তর স্বার্থে।

বিপরীতে, ভালো মানুষেরা প্রায়ই উল্টো পথে হাঁটেন। সামান্য মতভেদকেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। তাদের মাঝে ‘পারস্পরিক বিশ্বাসের’ এক তীব্র খরা বিরাজ করে। “সে কি আমার মতো সৎ?” এই অহেতুক সংশয় তাদের ঐক্যের মেরুদণ্ডকে নড়বড়ে করে দেয়। ফলে তাদের মাঝে একটা মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়।

এই দূরত্বকে আরও গভীর করে মানুষের অস্তিত্বগত ভয়।
জ্যঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন- ‘Hell is other people’. ভালো মানুষেরাও কখনও কখনও অন্য ভালো মানুষের চোখে ‘অন্য’ হয়ে ওঠে । তাদের চিন্তার পার্থক্য তাদেরকে ‘অপর’ করে তোলে। তারা ভয় পায়, অন্য ভালো মানুষের চিন্তা যদি নিজের সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অারেকটা সংকট হলো, ভালো মানুষেরা মিডিয়ার আলোয় আসেন না। তারা প্রচারের কাঙাল নন। ফলে সমাজের প্রচারযন্ত্রে তারা আড়ালে থেকে যান। আর এই নিঃশব্দতা সমাজকে অচল করে দেয়। ফলে মিডিয়ার আলোয় যারা মন্দ, তারা হাজির হয় ‘বিপ্লবী’, কিংবা ‘সাহসী’র মুখোশে। আর সত্যিকারের ভালোরা থেকে যায় পর্দার অন্তরালে। ফলে সাধারণ মানুষের চোখে ভালো মানুষের পরিচিতি হয় অস্পষ্ট, অনুজ্জ্বল।

ইতিহাসে এই নিঃশব্দটার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। Adolf Hitler-এর উত্থান শুধু নাৎসিবাদের জন্য হয়নি, ভালো মানুষের নিস্তবদ্ধতার জন্যও হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের গণহত্যা শুধু উগ্রবাদীদের কাজ নয়, বিশ্বমানবতার ব্যর্থতা।ফিলিস্তিনের কান্না শুধু ই*রায়েলের বুলেট নয়, পুরো দুনিয়ার ভালো মানুষদের বিভক্তির ফসল। যখনই ভালোরা নীতিতে দৃঢ় থেকেও রাজনীতি, কিংবা কৌশলে দুর্বল হয়েছে, তখনই সমাজ অশুভদের পদতলে পিষ্ট হয়েছে।

তাই সভ্যতা সবসময়ই ভালোদের ঐক্য চায়। কিন্তু আমাদের সমাজ এমনভাবে গঠিত, যেখানে ভালো মানুষদের অবস্থান প্রান্তে। তারা নীতিতে দৃঢ়, কিন্তু রাজনীতিতে দুর্বল; তারা ন্যায়ে স্পষ্ট, কিন্তু ঐক্যের অভাব। ফলে তারা হয় নিঃসঙ্গ, নাহয় বিভ্রান্ত।

প্রাচীন গ্রিক উপকথায় বলা আছে, জিউস একদিন সব ভালো মানুষকে ডেকে বলেছিলেন, “তোমাদের আলাদা আলাদা সত্য যদি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তাহলে মিথ্যার দরজাই খুলে যাবে।” আজকের যামানায় ঠিক এই সত্যের সংঘর্ষই মিথ্যার বিজয়কে ত্বরান্বিত করছে। ন্যায় যখন ন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তখন অন্যায় বিজয়োল্লাসে মত্ত হয়, আরো শক্তিশালী হয়।

ভালো মানুষেরা বিভক্ত; কথা সত্য, তবে অনিবার্য নয়। এটি কেবল একটি মানসিক জড়তা, যা বদলানো যায়। প্রয়োজন কেবল হৃদয়কে বৃহৎ করা, এবং আদর্শিক অনমনীয়তার চেয়ে বৃহত্তর কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া।

যেদিন শুভশক্তিরা তাদের ক্ষুদ্র মতভেদ বিসর্জন দিয়ে সম্মিলিত স্বরে আওয়াজ তুলবে, সেদিন ইতিহাস আবার আলোর মুখ দেখবে। অন্ধকার তখনই শাশ্বত নিয়মে আত্মসমর্পণ করবে, যখন প্রতিটি বিচ্ছিন্ন নক্ষত্র সমবেত হয়ে এক প্রদীপ্ত জ্যোতির্বলয় রচনা করবে।

খেজুরের গুড়ের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে ফরিদপুরে ২০ হাজার খেজুর বীজ বপন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ৭:৫৯ অপরাহ্ণ
খেজুরের গুড়ের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে ফরিদপুরে ২০ হাজার খেজুর বীজ বপন

ফরিদপুরের নগরকান্দায় হারিয়ে যেতে বসা খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে পুরাপাড়া ইউনিয়ন অনার্স ক্লাব। সংগঠনটির উদ্যোগে প্রায় ২০ হাজার খেজুর বীজ বপন করা হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ সৃষ্টি করেছে।

শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে নগরকান্দা উপজেলার পুরাপাড়া ইউনিয়নের ব্রাহ্মণডাঙ্গা গ্রামের কুমার নদের পাশের সড়কে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। পরে প্রায় ২০ জন স্বেচ্ছাসেবী ভ্যানযোগে ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের সড়ক এবং মুকসুদপুর-ভাঙ্গা অংশের এশিয়ান হাইওয়ের (বিশ্বরোড) প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় খেজুর বীজ ছড়িয়ে দেন।

আয়োজকরা জানান, একসময় ফরিদপুর অঞ্চল খেজুরের রস ও গুড়ের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেই ঐতিহ্যও প্রায় বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সিজিএ, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মামুনুর রশিদ বলেন, “ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড়ের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এ উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি করেছে। পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষায় এমন উদ্যোগ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।”

পুরাপাড়া ইউনিয়ন অনার্স ক্লাবের সভাপতি ও সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ওসমান মোল্যা বলেন, “ফরিদপুরের খেজুরের গুড় একসময় এ অঞ্চলের গর্ব ছিল। আজ সেই ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। খেজুর বীজ বপনের মাধ্যমে আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ফরিদপুর গড়ে তুলতে চাই।”

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারি তোলারাম কলেজের প্রভাষক মো. গিয়াস উদ্দীন জানান, এর আগে গত পাঁচ বছরে সংগঠনটির উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার তালবীজ রোপণ করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব এসব উদ্যোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে।

অনার্স ক্লাব গণগ্রন্থাগারের সভাপতি ও পুরাপাড়া কে.জি. স্কুলের প্রধান শিক্ষক এস. এম. ইউসুফ বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

কর্মসূচিতে মুকসুদপুর উপজেলার পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা ও ৪৫তম বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারিকুর রহমান অঙ্কন, সহকারী শিক্ষক তানভীর তালুকদার, শিক্ষার্থী হাসিবুল হাসান, মাজহারুল ইসলাম শাকিব, ব্যবসায়ী রাকিব হোসেন, কাজী শাকিল, রাজিবুল ইসলাম, নাসিরুজ্জামান সেজানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত পুরাপাড়া ইউনিয়ন অনার্স ক্লাব শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ সমাজের বিত্তবান ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেছেন, যাতে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা যায়।

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় গরু তাড়ানোর ‘অপরাধে’ শিশুকে গরুর রশিতে বেঁধে নির্যাতন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ৬:৫৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় গরু তাড়ানোর ‘অপরাধে’ শিশুকে গরুর রশিতে বেঁধে নির্যাতন

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় এক মাদরাসা শিক্ষার্থীকে গরুর রশি দিয়ে গরুর সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত কাওছার মৃধাকে আটক করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে হত্যা চেষ্টাসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

ভুক্তভোগী তামিম ইসলাম (১০) বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাসিন্দা। তিনি আলফাডাঙ্গা পৌরসভার নওয়াপাড়া গ্রামের চেরাগ আলীর বাড়িতে লজিং থেকে স্থানীয় মারকাজুল কুরআন মাদরাসার নাজেরা বিভাগে পড়াশোনা করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে মাদরাসার সীমানার ভেতরে কাওছার মৃধার একটি গরু ঢুকে গাছপালা খেতে শুরু করে। এ সময় তামিম গরুটিকে তাড়িয়ে দিলে গরুর মালিক কাওছার মৃধা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে তিনি তামিমকে গরুর রশি দিয়ে গরুর সঙ্গে বেঁধে ছেড়ে দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গরুটি দৌড় দিতে শুরু করলে তামিমও টেনে নিয়ে যেতে থাকে। এ সময় রশি তার গলায় পেঁচিয়ে যায় এবং শ্বাসরোধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। শিশুটির চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। রশির চাপে তার গলায় আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শুক্রবার সকালে নওয়াপাড়া ও কুচিয়াগ্রাম এলাকার মুরব্বিরা বিষয়টি নিয়ে সালিশ বৈঠকে বসেন। তবে কোনো সমাধান না হওয়ায় স্থানীয় যুবসমাজ অভিযুক্তের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির প্রস্তুতি নেয়।

এরই মধ্যে শুক্রবার দুপুরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত কাওছার মৃধাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোমিনুল ইসলাম সোহাগ বলেন, “একজন কোমলমতি শিশুর ওপর এ ধরনের অমানবিক নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।”

লজিং মালিক চেরাগ আলী বলেন, “তামিম আমার সন্তানের মতো ছিল। তার সঙ্গে এমন নির্মম আচরণে আমি মর্মাহত। আমি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”

মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আসাদুজ্জামান বলেন, “তামিম আমাদের মাদরাসার শিক্ষার্থী। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি।”

অভিযুক্তের ছোট ভাই বিশু মৃধা বলেন, “ঘটনার বিস্তারিত আমি জানি না। পুলিশ আমার ভাইকে আটক করেছে। তদন্তে যদি তার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত।”

আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফকির তাইজুর রহমান জানান, শিশু নির্যাতনের অভিযোগে কাওছার মৃধা নামের একজনকে আটক করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত মামলা হয়নি। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। মামলা দায়ের হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফরিদপুরে আর্জেন্টিনা ভক্তদের জন্য সুখবর, জার্সি পরলেই রোগীর চিকিৎসা ফি ৫০% ছাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ৫:২৬ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে আর্জেন্টিনা ভক্তদের জন্য সুখবর, জার্সি পরলেই রোগীর চিকিৎসা ফি ৫০% ছাড়

বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন মেতে উঠেছে গোটা বিশ্ব, তখন সেই উন্মাদনাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার এক চিকিৎসক। প্রিয় দল আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন—আর্জেন্টিনার জার্সি পরে চিকিৎসা নিতে এলে রোগীদের দিতে হবে মাত্র অর্ধেক ভিজিট।

এমন অভিনব উদ্যোগের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ স্থানীয় এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন আলফাডাঙ্গা উপজেলার চিকিৎসক ডা. সুমন রায়।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে উপজেলা সদর বাজারের হাসপাতাল রোডে অবস্থিত হেলথ এইড মেডিকেল সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আসা রোগীদের জন্য বিশেষ ছাড় কার্যকর করা হয়েছে। সাধারণত তার চেম্বারে চিকিৎসা পরামর্শের ফি ৫০০ টাকা হলেও আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আসা রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৫০ টাকা।

চেম্বার সূত্রে জানা যায়, উদ্যোগটি শুরুর প্রথম দিনেই বেশ কয়েকজন রোগী এই সুবিধা নিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। ফলে বিষয়টি দ্রুতই এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

আর্জেন্টিনার জার্সি পরে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী বলেন, “আমি বরাবরই আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক। চিকিৎসকের এমন ব্যতিক্রমী অফারের কথা শুনে জার্সি পরেই চেম্বারে এসেছি। সত্যিই তিনি আমার কাছ থেকে নির্ধারিত ফির অর্ধেক নিয়েছেন। বিষয়টি আমার কাছে বেশ আনন্দের লেগেছে।”

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডা. সুমন রায় গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় চিকিৎসক হিসেবে এলাকাজুড়ে তার সুনাম রয়েছে।

ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ সম্পর্কে ডা. সুমন রায় বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক। বিশ্বকাপ বা আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট এলেই উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। সেই আনন্দকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটু ভিন্নভাবে ভাগাভাগি করার চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ নিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “এটি সম্পূর্ণভাবে খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা থেকে করা একটি উদ্যোগ। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য এটি আমার পক্ষ থেকে ছোট্ট একটি শুভেচ্ছা উপহার। তবে এর ফলে চিকিৎসাসেবার মান বা দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটবে না। বরং খেলাধুলাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে আনন্দ ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সেটিকেই আরও উৎসাহিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”

স্থানীয়দের মতে, বিশ্বকাপ ঘিরে নানা ধরনের আয়োজন দেখা গেলেও চিকিৎসা ফিতে এমন বিশেষ ছাড়ের ঘটনা বেশ ব্যতিক্রমী। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ফুটবলপ্রেম, মানবিকতা ও ভিন্নধর্মী উদযাপনের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা কুড়াতে শুরু করেছে।