“কীভাবে ট্রাম্পবাদ বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে”
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ ২০২১ সালে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনামলের প্রথম মেয়াদকালে মোট ৩০ হাজার ৫৭৩টি ‘মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর’ বক্তব্য দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে টানা চার বছর নিজ দেশের নাগরিক এবং বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিদিন গড়ে ২১টি করে মিথ্যা কথা বলতেন তিনি। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে এসেও তিনি সেই অভ্যাসে একচুলও ছেদ টানেননি। এখনো নিয়মমাফিক তিনি আমেরিকান জনগণকে এবং গোটা বিশ্বকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন।
জনজীবনে সত্য ও সততার প্রতি এ প্রেসিডেন্টের নির্লজ্জ অবহেলার দেখা মিলছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনায় তার ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়ায় আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এ আচরণ। এ ঘটনা কেন্দ্র করে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা শুধু অশোভন নয়; বরং একই সঙ্গে বিপজ্জনকভাবে অনৈতিকও। নিরাপত্তা বাহিনীর বন্দুকের গুলিতে আমেরিকান নাগরিক নিহত হলেও, তিনি নাগরিকের পক্ষ না নিয়ে বরং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী নিরাপত্তাকর্মীর পক্ষ নিয়েছেন।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা করে বলেন, ‘আমার ক্ষমতার ওপর একমাত্র নিয়ন্ত্রণ হলো আমার নিজের নৈতিকতা এবং আমার নিজের মন।’ এ বক্তব্য থেকেই তার কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তার কাছে ন্যায়-অন্যায় কোনো সর্বজনীন মানদণ্ডে আবদ্ধ নয়; বরং সেটা সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিনির্ভর। তিনি নিজেই নিজের নৈতিক উপদেষ্টা, নিজেই নিজের আইনজ্ঞ, নিজেই নিজের যাজক। তার স্বীকারোক্তি শুধু নিজের কাছে; কোনো রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কিংবা নিজ দেশের জনগণের কাছে নয়। নিজেকে একক ব্যক্তিনির্ভর একটি গির্জা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন তিনি।
দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো, ট্রাম্প অন্যদের পাশাপাশি নিজেকেও মিথ্যা বলেন। আর এ আত্মপ্রবঞ্চনার পরিণতি ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষে এমন আচরণ সাধারণ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ভিত ভেঙে দেয়। মার্কিন ভোটারদের মতো বিদেশি নেতারাও ধীরে ধীরে এ প্রেসিডেন্টের দীর্ঘস্থায়ী মিথ্যাচারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। কিন্তু এ অভ্যাসকে প্রশ্রয় দেওয়ার মূল্য তাকে প্রশ্ন না করার, প্রতিবাদ না তোলার, শক্ত অবস্থান না নেওয়ার মূল্য দিন দিন গুণোত্তর হারে বাড়ছে। এ সুবাদে তার আচরণ হয়ে উঠছে আরও স্বৈরাচারী ও খামখেয়ালি।
ট্রাম্পের মিথ্যা ও প্রতারণা আজকের তিনটি জটিল ও অমীমাংসিত আন্তর্জাতিক সংকটে একটি সাধারণ, উত্তেজনাবর্ধক উপাদান হিসেবে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছেন, চীনা ও রুশ যুদ্ধজাহাজ গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে রেখেছে, যার ফলে নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে হস্তক্ষেপ করা জরুরি। অথচ ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন, যিনি ডেনমার্কের অধীন এই স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপটির বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ট্রাম্পের চেয়ে অনেক বেশি অবগত, তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রশ্ন তোলেন, ‘কোথায় এসব জাহাজ? অমাদের চোখে তো পড়ে না।’ গ্রিনল্যান্ডবাসীর কাছে ট্রাম্পের মন্তব্য নিছক প্রলাপ।
ডেনমার্ক স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তারা গ্রিনল্যান্ডে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এবং তথাকথিত ‘চীনা বিনিয়োগের বন্যা’ আরেকটি হোয়াইট হাউস-উৎপাদিত কল্পকাহিনি মাত্র। জরিপে দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডবাসী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিংবা ট্রাম্পের কাছে বিক্রি হওয়ার ঘোরবিরোধী। বস্তুত তারা স্বাধীনতা চায়। রাজা তৃতীয় জর্জের বাহিনীকে ২৫০ বছর আগে আমেরিকান ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করে যেই দেশের জন্ম হয়েছিল, তার পক্ষে অন্তত এ স্বাধীনতার মর্ম বোঝা উচিত। ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডকে ‘নিরাপদ’ করতে চান। কিন্তু বাস্তবে তিনি চান এ ভূখণ্ডের খনিজ সম্পদ কবজা করতে আর আমেরিকার সীমানা বৃদ্ধি করতে।
গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার ঘটনা ঘটানোর আগে মিথ্যার এক প্রলয়ংকরী স্রোত বইয়ে দেওয়া হয়। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ গোত্রের প্রধান বলে দাগিয়ে দেন। তার প্রশাসনে আমেরিকান নৌবাহিনী ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়া শুধু মাদক পাচারে জড়িত থাকার সন্দেহের বশে আমেরিকানদের কাছে প্রাণ হারিয়েছে এ নাবিকরা। বেআইনিভাবে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা দখল করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধরত অবস্থা’ ঘোষণা করেন ট্রাম্প।
বাস্তবতা হলো, ২০১৮ সালে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের ক্ষমতা-পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা লালন করে আসছেন তিনি। এখন তিনি নিজেই স্বীকার করছেন, এ অপারেশনের মূল লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার নয়; লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার জনগণকে ‘উদ্ধার’ করা বা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও নয়। লক্ষ্য একটাই—তেল। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে সাক্ষাতে সম্মত হন। ট্রাম্প নির্লজ্জ ও নির্মমভাবে দেশটির সম্পদ লুণ্ঠন করছেন। একই সঙ্গে হুমকি দিচ্ছেন মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকে।
সম্প্রতি ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেনেজুয়েলাকে অনির্দিষ্টকাল শাসন করার জন্য তার একটি ‘পরিকল্পনা’ আছে। এটিও আরেকটি নিরেট মিথ্যা। ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী ও মিলিশিয়া এখনো অক্ষত অবস্থায় আছে। মাদুরো নিজে ভেনেজুয়েলায় না থাকলেও তার স্বৈরতান্ত্রিক সরকার এখনো দেশটিতে টিকে আছে। আর ক্ষমতা দখলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক সাহসী গণতান্ত্রিক বিরোধী জোটের মুখে দেশটি অনিবার্য সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ব্যতীত ওয়াশিংটন ডিসি থেকে এ বিশৃঙ্খলার ঢাল থামানো সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ইউক্রেনের কথা ভুলে গেলেও চলবে না। এটি তৃতীয় একটি সংঘাতক্ষেত্র, যাকে ঘিরে ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যার খেলা রয়েছে চলমান। বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে কোন পদক্ষেপটি সঠিক ও ন্যায় এবং কোনটি বেঠিক ও অন্যায়—ট্রাম্পের পক্ষে সেটা চিহ্নিত করতে পারার অক্ষমতা ইউরোপের ক্ষতি ডেকে আনছে। নির্বাচনী প্রচারণার দরুন তিনি মিথ্যা বলেছিলেন যে, ক্ষমতায় এলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন। সে ব্যাপারে ব্যর্থ হয়ে তিনি বারবার ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু পুতিন বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে তাকে সাময়িকভাবে তুষ্ট করে বরাবরই বোমাবর্ষণ চালিয়ে গেছেন। আর প্রতিবারই ট্রাম্প দুর্বলভাবে পিছু হটেছেন, দোষ চাপিয়েছেন ইউক্রেনীয় নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর।
ট্রাম্পের এ দ্বিচারিতা কিয়েভকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের মিত্রদের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিয়েছে। একদিন তিনি ন্যাটো নেতাদের তেলচিটে প্রশংসা সগর্বে গ্রহণ করেন, তো পরদিনই জোটটিকে উপহাস এবং অবজ্ঞা করে বলেন, ইউরোপ সভ্যতার বিলুপ্তির মুখে পৌঁছে গেছে। গত সপ্তাহে তিনি দাবি করেন, সংকটের সময়ে ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করবে না। এটিও ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর এবং আফগানিস্তানে ২০ বছরের ব্যর্থ অভিযানের দরুন ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, ইউরোপীয় দেশগুলো এ চুক্তিকে সম্মান করতে জানে।
গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন সমসাময়িক সংকটগুলোর মধ্যে ট্রাম্পের অসততার বাইরেও আরও কিছু ব্যাপারে মিল রয়েছে। তিন ক্ষেত্রেই উদ্বেগজনকভাবে প্রকাশ পেয়েছে ইউরোপের নেতাদের দুর্বলতা, বিভাজন এবং একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অক্ষমতা। এখন নিশ্চয়ই ইউরোপকে মেনে নিতে হবে, এ প্রেসিডেন্টের ওপর তারা আর আস্থা রাখতে পারে না। আর এ ভীতিকর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে যে, ব্রেক্সিট ছিল চরম ভুল একটি সিদ্ধান্ত। যুক্তরাজ্যের পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোট ত্যাগ করার সিদ্ধান্তটা আত্মঘাতী বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা, সার্বভৌম অধিকার ও ভৌগোলিক স্বাধীনতার প্রকাশ্য লঙ্ঘন ঘটিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। জাতিসংঘ-সমর্থিত নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার জায়গায় নব্য-সাম্রাজ্যবাদী প্রভাববলয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে বর্তমান প্রশাসন, যা এ তিন আন্তর্জাতিক সংকটেই স্পষ্ট। একই সঙ্গে স্পষ্ট সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা। অহংকারবশত ও বেআইনিভাবে ভেনেজুয়েলার সর্বশেষ নির্বাচনকে বাতিল ও অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে লেগেছে রাশিয়া। গ্রিনল্যান্ডবাসীরা বলছে, তারা তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার চায়। অথচ এসব ক্ষেত্রেই অন্যায়ভাবে জয়ী হচ্ছে অধিক ক্ষমতাধর পক্ষ।
এ প্রবণতাগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। তবে ২০২৫ সালে এগুলোকে নিঃসন্দেহে ত্বরান্বিত করেছে ট্রাম্পের অস্থিতিশীল, নীতিহীন, আইনবহির্ভূত, বিশৃঙ্খল এবং মৌলিকভাবে অনৈতিক আচরণ। এসব অনিষ্টের মধ্যে তার নৈতিক অবক্ষয়ই সবচেয়ে ভয়ংকর। এ নতুন যুগে দেখা দিচ্ছে ‘ট্রাম্পবাদ’ নামক এক বিধ্বংসী রোগ, যা বিশ্বমানবতার ওপর কলুষ ছড়ায়, তাকে বিপর্যস্ত করে, অন্ধকারে ঢেকে দেয় ও বিষাক্ত করে তোলে। এর শিকার শুধু আমেরিকান নাগরিকরা নয়, বরং বিশ্বব্যাপী সবাই।
মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ‘মিথ্যা তিন প্রকার—সাধারণ মিথ্যা, অসাধারণ মিথ্যা আর পরিসংখ্যানগত মিথ্যা।’ আমি তার কথাটিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটু পরিবর্তন করে বলব যে, রাজনীতির প্রাঙ্গণে মিথ্যা তিন প্রকার—সাধারণ মিথ্যা, অসাধারণ মিথ্যা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিথ্যা। এখন সময় এসেছে, অন্যায় ক্ষমতা চর্চার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার। ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইউরোপের মিত্রশক্তিদের আরও দৃঢ় হতে হবে। নচেৎ, ইতিহাসের অদক্ষ, স্বার্থপর ও স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশাহদের মতো ট্রাম্পও হয়তো এমন কিছু করে বসবেন, যা আর ফেরানো যাবে না।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার সহকারী সম্পাদক, আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে নিয়োজিত স্থায়ী প্রতিবেদক। নিবন্ধটি ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের মতামত বিভাগ থেকে অনুবাদ করেছেন অ্যালেক্স শেখ

আপনার মতামত লিখুন
Array