খুঁজুন
, ,

আমলাতন্ত্র কি বিফলতার ঢাল, না-কি রাষ্ট্রের অপরিহার্য রক্ষাকবচ?

শামীম আল মামুন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ
আমলাতন্ত্র কি বিফলতার ঢাল, না-কি রাষ্ট্রের অপরিহার্য রক্ষাকবচ?

বাংলাদেশে পণ্ডিতের অভাব নেই। তবে সংখ‍্যার দিক দিয়ে সব চেয়ে বেশি বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত দেখা যায় প্রশাসন বিষয়ে। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিক থেকে শুরু করে ফুটপাথে বসে অলস আড্ডা দেয়া অক্ষম ব্যক্তিটিও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে, নিদেন পক্ষে তাঁর অক্ষমতার জন্য প্রশাসনকে দায়ী করেন।

আমি কোনো পণ্ডিত নই বা কখনো তা হবার চেষ্টাও করিনি। নিজের অজ্ঞতা নিয়ে আমি সবসময় সংকুচিত থাকি। তথাপি আমার শিক্ষকগণ, দেশী-বিদেশী বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীদের এক বিরাট অংশ মনে করেন আমি জনপ্রশাসন বিষয়টা খুব ভালো বুঝি। জনপ্রশাসন বুঝার জন‍্য লোকপ্রশাসন পাঠই যথেষ্ট নয়। প্রশাসন বুঝার জন্য দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, লোকাচার, সামাজিক মনোবিজ্ঞান, সমাজের ক্ষমতা-কাঠামো সমন্ধে স্বচ্ছ জ্ঞান থাকার সাথে সাথে গভীর অন্তর্দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, আমি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বুঝি। দায়িত্ব নিয়েই বলছি যে, এর উত্থান-পতনের উপলক্ষ‍্য এবং উপাদান ব‍্যাখ‍্যা করতে পারি। বন্ধুমহলের আড্ডায় অনেকবার প্রশাসন ও রাজনীতি নিয়ে যা বলেছি তা পরবর্তীতে সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

পৃথিবীর সকল দেশেই আমলারা কখনো রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কোনো কথার প্রতিবাদ করে না বা করতে পারে না। তারা হলো ফুটবলের মত। ২২ জন খেলোয়াড় একটি সীমাবদ্ধ মাঠে লাথি দিতে থাকে এবং বল বিনা প্রতিবাদে সেই লাথি সহ্য করে। বলের মত আমলাদেরও সকল দোষ অপবাদ মাথায় নিয়ে নীরবে কাজ বা অকাজ করে যেতে হয়।

গত কয়েক দিন যাবৎ সরকারের উপদেষ্টাগণ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা, পরিযায়ী পণ্ডিতগণসহ অনেকেই সকল ব‍্যর্থতার দায় আমলাদের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতার দায়ভার থেকে মুক্তির চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন হতো না, যদি না কিছুদিন আগে একজন উপদেষ্টা মাইলস্টোন স্কুলের পরিবর্তে সচিবালয়ে মধ্যে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার বাসনা প্রকাশ না করতেন। তাঁর হতাশা এবং আমলাতন্ত্রের প্রতি শত্রুভাবাপণ‍্যতা কত প্রবল তা পত্রিকায় প্রকাশিত বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। তাঁর ব‍্যক্তিগত অনুভূতি গণমাধ্যমে প্রকাশ করে তিনি আমলাতন্ত্রকে জনগণের শত্রু হিসাবে উপস্থাপনের প্রয়াস নিয়েছেন – যা মেনে নিতে না পেরে আমি এই লেখা লিখছি।

আমলাতন্ত্রের সমালোচনা নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে একে ধ্বংস করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা গভীর সংকটে আছি।

আসলে আমলাতন্ত্র কী এবং কেন এটি এমন—তা বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি।

১. ম্যাক্স ওয়েবার এবং যৌক্তিক কাঠামো:

আমলাতন্ত্রের জনক বলা হয় ম্যাক্স ওয়েবারকে (Max Weber)। তিনি বলেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্র হলো ‘সবচেয়ে যৌক্তিক এবং কার্যকর উপায়’। তার মতে, আমলারা আবেগ বা রাজনৈতিক হুজুগে নয়, বরং নির্দিষ্ট নিয়মের (Rule of Law) অধীনে কাজ করে। এই যে আমরা ‘ধীরগতি’র কথা বলি, ওয়েবারের দৃষ্টিতে এটি আসলে একটি ‘নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত’ পদ্ধতি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া।

২. কার্ল মার্ক্স ও আমলাতন্ত্রের দ্বান্দ্বিক অবস্থান:

কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) আমলাতন্ত্রকে শাসক শ্রেণির হাতিয়ার হিসেবে দেখলেও তিনি একে রাষ্ট্রের একটি ‘অপরিহার্য অঙ্গ’ হিসেবে স্বীকার করেছেন। মার্ক্সীয় বিশ্লেষণে আমলাতন্ত্র হলো রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষার একটি মাধ্যম। যখন কোনো সংকট তৈরি হয়, তখন রাজনীতিবিদরা দায় এড়াতে আমলাতন্ত্রকে ‘বলির পাঁঠা’ বানান, যা বর্তমানে আমরা বাংলাদেশেও দেখতে পাচ্ছি। অথচ এই কাঠামোটিই রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।

৩. ঐতিহাসিক সত্য: কেন আমলাতন্ত্র ধীর?

পৃথিবীর কোনো সফল রাষ্ট্রই হুটহাট সিদ্ধান্তে চলেনি। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত সর্বত্র আমলাতন্ত্র একটি ‘ফিল্টার’ হিসেবে কাজ করে। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson) তার ‘The Study of Administration’-এ স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনীতি এবং প্রশাসন দুটি ভিন্ন মেরু। রাজনীতি স্বপ্ন দেখায়, আর প্রশাসন সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার কঠিন আইন ও বাজেটের নিক্তিতে বিচার করে। এই বিচার করতে গিয়ে যে সময় ব্যয় হয়, তাকে ‘অদক্ষতা’ বলা ভুল।

যারা খোঁজ খবর রাখেন তাঁরা জানেন পৃথিবীর সকল দেশের আমলাতন্ত্রই ধীরগতিতে চলে। যে রাষ্ট্র যত উন্নত সে রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র তত শক্তিশালী। আমাদের ধারণাগত সীমাবদ্ধতা এবং তথ‍্যের অপ্রতুলতার কারণে সফল রাষ্ট্রগুলোর আমলাতন্ত্র সম্পর্কে না জেনে আমরা অনেক মন্তব্য এবং আমাদের আমলাতন্ত্র তুলনা করে থাকি। উন্নত রাষ্ট্রসমূহের সেবাখাত বেসরকারি ব‍্যবস্থাপনায় ছেড়ে দিয়ে তারা প্রতিযোগিতামূলক অবকাঠামো তৈরি করে দেয়াতে ঐসব দেশে সেবা প্রদানের মান ও দক্ষতা বাণিজ‍্যিক কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের সেবাখাত পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকায় এখানে অদক্ষতা ও দুর্নীতি বেশী এবং সেবার মান হতাশাজনক। সেবাখাতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ – আমলাতন্ত্র নয়। আমেরিকা, ইউকে, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, জাপান, রাশিয়া সিংগাপুর, ইন্ডিয়াসহ পৃথিবীর যে কোনো স্থিতিশীল দেশের আমলাতন্ত্র আমাদের দেশের আমলাতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাধর এবং মজবুত। পিরামিড থেকে তাজমহল পৃথিবীর সকল অত‍্যাশ্চর্য স্থাপনা নির্মাণের পিছনে আছে সুসংগঠিত এবং সুদক্ষ এক আমলাতন্ত্র।

আমরা অনেকেই আইনের শাসন (rule of law) নিয়ে কথা বলি। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক তা আমরা চাই। কিন্তু আমরা একবারও ভাবি না যে আইনের শাসন মানেই দল নিরপেক্ষ এক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান। আমলাগণ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সকলকে এক দৃষ্টিতে দেখবেন। তখন আমলাগণ এখনকার চেয়ে শক্তিশালী হবেন।

এবার অন্য প্রসঙ্গে কথা বলি। আমলাদের যতটা ক্ষমতাবান হিসেবে বিবেচনা করা হয় আসলে তাঁরা তা নন। গত তিন দশক যাবৎ মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নির্বাহী প্রধান হচ্ছেন মন্ত্রী/উপদেষ্টা। তাই সকল মন্ত্রণালয়ের ভালো মন্দ যাই হোক না কেন তাতে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী/উপদেষ্টার বিশাল ভূমিকা বা দায় আছে।

বাংলাদেশের বর্তমান আমলাতন্ত্র অত্যন্ত দুর্বল এবং disoriented। জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এটাকে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থে ধীরে ধীরে দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে আইনের শাসন থেকে দেশ যোজন যোজন মাইল দূরে ছিটকে পড়েছে। গত ১৭/১৮ ধরে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সততা ও দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দেশের আমলাতন্ত্রই প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছে। আর দূর্বল আমলাতন্ত্রের কারণে দেশে এমন কোনো অপরাধ নেই যা ঘটেনি। লক্ষকোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। বৈদেশিক ঋণ সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড স্পর্শ করেছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে অদক্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ এরকম একটি দুর্বল ভঙ্গুর আমলাতন্ত্রকে যদি পরিচালনা করতে না পারে তাহলে জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত‍্যাশা পূরণ করবে কিভাবে!

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর আকাঙ্ক্ষা এই জনপদের দীর্ঘ দিনের। এমন কোনো পরীক্ষা নেই যা এদেশের মানুষ দেয়নি। সাধারণ মানুষের ত‍্যাগ বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে অনেক বেশি। অন‍্যান‍্য প্রতিষ্ঠান সচল করার সাথে সাথে একটি শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ছাড়া সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুফল পেতে সৎ-দক্ষ-দলনিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনদের সাধারণ প্রবণতা হলো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন ঘটানো। কিন্তু এটা সবসময় ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনা। অনেক সময় আমলাগণ সেটা ধরিয়ে দিতে গেলেই রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ তা পছন্দ করেন না। বাস্তবে আমলাগণ ad hoc wisdom এর ভিত্তিতে চলতে পারেন না – তাকে আইন কানুন বিধিবিধান অনুসরণ করে যৌক্তিক পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটা দেশও কখোনো ad hoc wisdom দ্বারা চলতে পারে না – চলা উচিত না।

শেষাংশ:

যারা আমলাতন্ত্রের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন, তারা আসলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শনই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। একজন প্রাক্তন আমলা যখন সচিবালয়ে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার প্রত্যাশা করেন, তখন বুঝতে হবে তিনি নিজের পেশাগত অতীত এবং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর প্রতি অশ্রদ্ধাশীল। আমলাতন্ত্র কোনো ত্রুটিমুক্ত ব্যবস্থা নয়, তবে এটি পরিবর্তনের পথ ‘ধ্বংস’ নয়, বরং ‘সংস্কার’। আমলাতন্ত্রকে তার কাজের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। যে কোনো বিচ‍্যুতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার হওয়া উচিৎ। মাথা ব্যাথার চিকিৎসা দরকার তবে তা মাথা কেটে নয়।

জনপ্রিয়তা পাওয়ার সস্তা আশায় রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে জনশত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর এই অপচেষ্টা দেশের স্বার্থে সকল পক্ষ থেকে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

লেখক : প্রশাসনের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা

জ্বর থাকলে কি গোসল করা ক্ষতিকর? যা বলছেন বিশেষজ্ঞ

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ
জ্বর থাকলে কি গোসল করা ক্ষতিকর? যা বলছেন বিশেষজ্ঞ

জ্বর আসলে শরীরে অস্বস্তি, ক্লান্তি এবং ঘাম হওয়া খুব স্বাভাবিক। এই অবস্থায় গোসল করা নিয়ে আমাদের সমাজে নানা রকম মত প্রচলিত আছে। কেউ বলেন জ্বর থাকলে একদমই গোসল করা যাবে না, আবার কেউ বলেন ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে জ্বর কমে যাবে।

এই নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন ভারতের ফরিদাবাদের অমৃতা হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সঞ্জয় রায়না।

ভ্রান্ত ধারণা ও বাস্তবতা

সাধারণত মনে করা হয় যে জ্বরের সময় গোসল করলে শরীরের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসকের মতে, এটি একটি ভুল ধারণা। প্রকৃতপক্ষে, হালকা গরম বা কুসুম কুসুম গরম পানিতে গোসল করা অধিকাংশ মানুষের জন্য নিরাপদ এবং এটি জ্বর নিরাময়ে সাহায্য না করলেও রোগীকে অনেকটা সতেজ ও আরামদায়ক অনুভব করতে সাহায্য করে। এর ফলে শরীর থেকে ঘাম পরিষ্কার হয় এবং শরীর প্রাকৃতিকভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

কেন ঠান্ডা পানি এড়িয়ে চলবেন?

অনেকেই মনে করেন বরফ-ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমবে। কিন্তু চিকিৎসকরা এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন। ডা. রায়নার মতে, খুব ঠান্ডা পানি শরীরে কাঁপুনি সৃষ্টি করতে পারে, যা পেশিতে তাপ তৈরি করে এবং শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া ঠান্ডা পানি অস্বস্তি এবং কাঁপুনি বাড়িয়ে দেয়।

অতিরিক্ত গরম পানিও ক্ষতিকর

ঠান্ডা পানির মতো অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে গোসল করাও ঠিক নয়। কারণ অতিরিক্ত গরম পানি:

ঘামের মাধ্যমে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি করতে পারে।

মাথা ঘোরার সমস্যা বাড়াতে পারে।

শরীরের তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং শারীরিক অস্বস্তি তৈরি করে।

তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, হালকা গরম পানি ব্যবহার করা, যা শরীরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে না।

কখন গোসল করা থেকে বিরত থাকবেন?

জ্বর থাকলেও গোসল করা নিরাপদ হলেও কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি এড়িয়ে চলাই ভালো। যদি রোগী:

প্রচণ্ড দুর্বল অনুভব করেন।

মাথা ঘোরে বা জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হয়।

বিভ্রান্তি বা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকেন।

নিজে নিরাপদভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে না পারেন।

খুব বেশি জ্বরের সাথে গুরুতর অসুস্থতা থাকে। এমন অবস্থায় গোসলের চেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বিশ্রাম নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

সুস্থ হতে আরও যা প্রয়োজন

মনে রাখতে হবে, জ্বর কোনো রোগ নয় বরং এটি শরীরে অন্য কোনো সংক্রমণের উপসর্গ। তাই শুধু শরীরের তাপমাত্রা কমানোর দিকে নজর না দিয়ে চিকিৎসকরা আরও কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দিতে বলেছেন:

প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও পানি পান করে শরীর হাইড্রেটেড রাখা।

পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া।

পুষ্টিকর ও হালকা খাবার খাওয়া।

প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

যদি জ্বর দুই থেকে তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে, শ্বাসকষ্ট হয়, তীব্র মাথাব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যায়, বারবার বমি হয় কিংবা রোগী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।শিশু, বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জ্বরের বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, জ্বর মানেই গোসল বন্ধ নয়। নিয়ম মেনে হালকা গরম পানিতে গোসল করলে আপনার শরীর পরিষ্কার থাকবে এবং আপনি মানসিকভাবেও স্বস্তি বোধ করবেন, যা দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

ক্ষুধা লাগলে মেজাজ ঠিক থাকে না, এটা কি কোনও রোগের লক্ষণ?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ
ক্ষুধা লাগলে মেজাজ ঠিক থাকে না, এটা কি কোনও রোগের লক্ষণ?

ব্যস্ত জীবনের চাপে অনেক সময়ই আমাদের দুপুর বা রাতের খাবার খেতে দেরি হয়ে যায়। আর তখনই দেখা যায় অদ্ভুত এক সমস্যা—সামান্য কারণেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠছে, ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি আমরা। ইংরেজিতে এই অবস্থাকে বলা হয় ‘হ্যাঙ্গরি’ (Hangry), যা মূলত ‘হাঙ্গার’ (Hunger) এবং ‘অ্যাংরি’ (Angry) শব্দের সমন্বয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্ষুধা লাগলে কেন এমন হয়? এটি কি কোনো শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ, নাকি কেবলই মনের খেয়াল?

গবেষণা কী বলছে?

সম্প্রতি জার্মানির টুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয় ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিলস ক্রোমার এবং তার গবেষক দল ৯০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর এক মাসব্যাপী একটি গবেষণা চালান। তাদের প্রত্যেকের শরীরে গ্লুকোজ মনিটর বসানো হয়েছিল এবং দিনে দুবার স্মার্টফোনের মাধ্যমে তাদের মেজাজ ও ক্ষুধার মাত্রা রেকর্ড করা হতো। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষুধা লাগলে মেজাজ বিগড়ে যাওয়াটা কেবল রক্তে শর্করার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না। বরং যারা তাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ সংকেতগুলো দ্রুত বুঝতে পারেন না, তারাই বেশি মেজাজ হারা।

মস্তিষ্কের খেলা

মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশটি যখন শরীরে শক্তির ঘাটতি শনাক্ত করে, তখন ক্ষুধার সংকেত পাঠায়। অন্যদিকে, আমাদের মস্তিষ্কের ‘ইনসুলা’ নামক অংশটি স্বাদ এবং আবেগ উভয়টিই নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষুধা এবং মেজাজের এই মেলবন্ধন আসলে আমাদের বিবর্তনেরই অংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেলেই মানুষের মেজাজ খারাপ হয় না; বরং যখন মানুষ সচেতনভাবে বুঝতে পারে যে সে ক্ষুধার্ত, তখনই তার মেজাজ বিগড়াতে শুরু করে।

ইন্টারোসেপশন : সুস্থতার চাবিকাঠি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় শরীর যখন তার অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনগুলো (যেমন- ক্ষুধা, তৃষ্ণা বা ক্লান্তি) শনাক্ত করতে পারে, তখন তাকে বলা হয় ‘ইন্টারোসেপশন’। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ইন্টারোসেপ্টিভ ক্ষমতা বা শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বোঝার ক্ষমতা বেশি, তারা ক্ষুধার্ত থাকলেও নিজেদের মেজাজ তুলনামূলক বেশি স্থিতিশীল রাখতে পারেন। অন্যদিকে, যারা এই সংকেতগুলো বুঝতে দেরি করেন, তারা হুট করে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন।

এটি কি কোনো রোগ?

ক্ষুধা লাগলে মেজাজ খিটখিটে হওয়া সরাসরি কোনো রোগ নয়, তবে এটি শরীরের একটি সতর্কবার্তা। দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের এই সংকেতগুলোকে উপেক্ষা করলে তা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি পারিবারিক বা কর্মক্ষেত্রে সম্পর্কের অবনতি ঘটায় এবং অনেক সময় মানুষকে আবেগপ্রবণ হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বা অস্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে বাধ্য করে।

কেন কেউ কেউ দ্রুত ‘হ্যাঙ্গরি’ হয়ে পড়েন?

১. সচেতনতার অভাব: অনেক সময় কাজে বা ডিজিটাল ডিভাইসে এত বেশি মগ্ন থাকা হয় যে, ক্ষুধার প্রাথমিক সংকেতগুলো আমরা খেয়াল করি না। ফলে হঠাৎ করেই শক্তির মাত্রা কমে যায় এবং মেজাজ বিগড়ে যায়।

২. শিশুদের ক্ষেত্রে: শিশুদের শরীর ও মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়, তাই তারা তাদের শরীরের সংকেতগুলো বড়দের মতো বুঝতে পারে না। এ কারণেই খাবার খেতে দেরি হলে শিশুরা হঠাৎ করে কান্নাকাটি বা জেদ শুরু করে।

মেজাজ ঠিক রাখার উপায়

খাবারের নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখা: যখনই আমরা খাবার এড়িয়ে যাই বা দেরি করি, তখনই মেজাজ বিগড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই নিয়মিত বিরতিতে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা জরুরি।

ব্যায়াম ও শারীরিক সক্রিয়তা: নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীর তার ক্ষুধার সংকেতগুলো আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে এবং বিপাক প্রক্রিয়া উন্নত হয়।

শরীরের কথা শোনা: নিজের শরীরের চাহিদা সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। মেজাজ বিগড়ানোর আগে যখনই সামান্য ক্ষুধা অনুভব করবেন, তখনই হালকা কিছু খেয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

পরিশেষে বলা যায়, ‘হ্যাঙ্গরি’ হওয়া কোনো রোগ নয়, বরং শরীর যখন জ্বালানি বা শক্তি চায়, তখন মস্তিষ্ক আমাদের এই মেজাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে সতর্ক করে দেয়। তাই নিজেকে এবং পরিবারকে এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে বাঁচাতে ক্ষুধার লক্ষণগুলো সময়মতো চিনে নেওয়া এবং নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

ফরিদপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের ঘোষণা আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়ও হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের ঘোষণা আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়ও হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা, পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণ, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ, কৃষকদের জন্য পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

শনিবার (০৪ জুলাই) বিকেলে ফরিদপুর শহরের থানা রোডের ব্যাংক এশিয়া মোড়ে ফরিদপুরের নাগরিক কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত ‘নাগরিক আলোচনা ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, “পদ্মা ব্যারেজ হবে। এটি একনেকে পাস হয়েছে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। দেশের পানির সমস্যা সমাধানে পদ্মা ব্যারেজের পাশাপাশি তিস্তা ব্যারেজও বাস্তবায়ন করা হবে।”

তিনি বলেন, দেশের পানি সংকট মোকাবিলায় খাল খননের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফরিদপুরের উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ফরিদপুরবাসীর ভাগ্য উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা এবং ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে ফরিদপুরের জনসভায় এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ, আপনাদের সহযোগিতায় ফরিদপুর বিভাগ হবে এবং সিটি করপোরেশনও হবে।”

নিজের নির্বাচনী এলাকা সালথা ও নগরকান্দার কৃষকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক কৃষক উৎপাদিত পেঁয়াজ ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধানে কৃষি মন্ত্রণালয় পেঁয়াজ সংরক্ষণের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, “খুব শিগগিরই পেঁয়াজ চাষিদের জন্য আধুনিক স্টোরেজ বা সংরক্ষণাগারের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তারা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারেন।”

ফরিদপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, “ফরিদপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে। এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে। ফরিদপুরের চারজন সংসদ সদস্যই এ দাবি তুলেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। অবশ্যই ফরিদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় হবে।”

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. রফিকুল ইসলাম।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. মো. ইলিয়াস মোল্লা, ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ এবং জেলা বিএনপির সভাপতি মোদাররেস আলী ইছাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিবীদ ও ব্যবসায়ীক নেতৃবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ফরিদপুর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও রাজবাড়ী সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. শওকত আলী মোল্লা।