খুঁজুন
সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১৪ বৈশাখ, ১৪৩৩

ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যা, স্বামীর যাবজ্জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬, ৩:২১ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যা, স্বামীর যাবজ্জীবন

ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে আহাদ শেখ (৩০) নামে স্বামীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১২টার দিকে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার সময় আসামি আহাদ শেখ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে পুলিশ পাহারায় আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়।

দণ্ডপ্রাপ্ত আহাদ শেখ ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লভদী গ্রামের মৃত বাদশা শেখের ছেলে।

এ মামলার অপর দুই আসামি মাহিন শেখ ও সরুজ শেখকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদেরকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) গোলাম রব্বানী ভুইয়া রতন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত এ রায় প্রদান করেছেন।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুরের সালথা উপজেলার কাগদী গ্রামের বাসিন্দা মোছা. রোমেছা বেগমের মেয়ে রুবাইয়া বেগমের সঙ্গে একই উপজেলার বল্লভদী গ্রামের আহাদ শেখের কয়েক বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে নগদ টাকা দেওয়া হলেও পরবর্তীতে আরো তিন লাখ টাকা দাবি করে স্বামী আহাদ শেখ ও তার পরিবারের সদস্যরা। পরে এক লাখ টাকা দিলেও বাকি দুই লাখ টাকার জন্য রুবাইয়া বেগমের ওপর নিয়মিত চাপ ও নির্যাতন চালানো হয়। ২০১৭ সালের ১ আগস্ট যৌতুকের টাকা নিয়ে স্বামী আহাদ শেখের সঙ্গে রুবাইয়ার বিরোধ সৃষ্টি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এ সময় আহাদ শেখ স্ত্রীকে মারধর করে এবং পরিকল্পিতভাবে বিষাক্ত পদার্থ খাইয়ে দেয়। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার পর নিহতের মা রোমেছা বেগম বাদী হয়ে সালথা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলাটি তদন্ত শেষে সালথা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আতিয়ার রহমান আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। তদন্তে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন ও হত্যার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ শেষে আদালত প্রধান আসামি আহাদ শেখকে দোষী সাব্যস্ত করে এ রায় ঘোষণা করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গোলাম রব্বানী ভুইয়া রতন বলেন, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন ও হত্যার বিষয়টি আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে। তাই আদালত আসামির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করেছেন। এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।

কওমি সনদের স্বীকৃতি : পূর্ণ বাস্তবায়নের অপেক্ষা আর কতকাল?

মুফতী নিজাম উদ্দিন আল আদনান
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:১০ পূর্বাহ্ণ
কওমি সনদের স্বীকৃতি : পূর্ণ বাস্তবায়নের অপেক্ষা আর কতকাল?

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। একটি ভূখণ্ডে যখন বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রস্বীকৃত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করে, তখন দেশের সুষম উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই ২০১৮ সালে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’কে মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান দিয়ে আইন পাস করা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এটি ছিল যুগান্তকারী এবং প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ।

এর মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে অবহেলিত লাখ লাখ কওমি শিক্ষার্থীর সামনে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির এক বিশাল দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আইনি স্বীকৃতি মিললেও প্রায় এক দশক পার হয়ে যাওয়ার পরও এই স্বীকৃতির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন আজও অধরাই থেকে গেছে। ফলে যে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে এই সিদ্ধান্তের সূচনা হয়েছিল, তা যেন আজ এক অদৃশ্য দেয়ালে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।

কওমি সনদের এই খণ্ডিত স্বীকৃতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর নিচের স্তরগুলোর কোনো স্বীকৃতি না থাকা। একজন শিক্ষার্থী যখন দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন, তখন তিনি কেবল মাস্টার্স সমমানের একটি সনদ পান। কিন্তু এর পূর্ববর্তী ধাপগুলো অর্থাৎ ইবতিদাইয়্যাহ, মুতাওয়াসসিতাহ, সানাবিয়্যাহ ও ফজিলতকে যথাক্রমে প্রাথমিক, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি সমমান প্রদান করা হয়নি।

যেকোনো সাধারণ বা সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রতিটি স্তরের সনদের তথ্য এবং জিপিএ উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু কওমি শিক্ষার্থীদের নিচের স্তরগুলোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় সমমান না থাকায় তারা চাইলেও সাধারণ চাকরির প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারছেন না। ফলশ্রুতিতে মাস্টার্স সনদ পকেটে নিয়েও হাজার হাজার মেধাবী তরুণ বেকারত্বের গ্লানি টানছেন অথবা নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় পরিমণ্ডলের বাইরে তাদের কর্মক্ষেত্রের পরিধি বাড়াতে পারছেন না। এটি কেবল ওই শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার নয়, বরং জাতীয় মেধার অপচয়ও বটে।

অন্যদিকে, শুধু সনদ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না, যদি না সেই সনদের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায়। সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কওমি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দৃশ্যমান নেই। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা বিসিএস-এর সাধারণ ক্যাডারগুলোতে আবেদনের জন্য যে ধরনের সমন্বিত যোগ্যতা ও বয়সসীমার ফ্রেমওয়ার্ক প্রয়োজন, তা কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য আজও পুরোপুরি স্পষ্ট বা প্রস্তুত করা হয়নি। এছাড়া দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার দ্বার এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতাকে অবমূল্যায়ন করা হয় কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অজুহাতে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। এই বৈষম্য দূর না হলে সমমান প্রদানের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

তবে কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য কেবল সরকারের দিকে চেয়ে থাকলেই চলবে না, কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকেও যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে হবে। কওমি মাদ্রাসার নিজস্ব স্বকীয়তা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের শেকড় অক্ষুণ্ণ রেখেই তাদের পাঠ্যক্রমে আধুনিক ভাষা শিক্ষা বিশেষ করে ইংরেজি, আধুনিক গণিত, বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সনদের কার্যকর ব্যবহারের জন্য সাধারণ শিক্ষার সাথে একটি বৈজ্ঞানিক মেলবন্ধন তৈরি করা সময়ের দাবি। অন্যথায় আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের কর্মক্ষেত্রে কওমি শিক্ষার্থীরা শুধু সনদের জোরে টিকতে পারবেন না।

সবশেষে বলা যায়, কওমি সনদের স্বীকৃতি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য দেওয়া হয়নি। একে অর্থবহ করতে হলে একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী জাতীয় নীতিমালা তৈরি করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআ’তিল কওমিয়া বাংলাদেশ-কে একসাথে বসে এই অচলাবস্থা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। কওমি শিক্ষার্থীদের মেধা ও শ্রমকে দেশের জাতীয় অগ্রগতিতে কাজে লাগাতে হলে সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, সরকার এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মেধার সঠিক মূল্যায়ন করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

লেখক: সাবেক সভাপতি, ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ

খাবারের শুরুতে তিতা খাবার খেলে কী হয়?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ
খাবারের শুরুতে তিতা খাবার খেলে কী হয়?

আমাদের অনেকের অভ্যাস দুপুরের খাবারের শুরুতেই তিতা কিছু দিয়ে ভাত খাওয়া। বিশেষ করে করলা ভাজি অনেকেরই পছন্দের তালিকায় থাকে, আবার অনেকে এর তিতা স্বাদের কারণে এড়িয়ে চলেন। তবে স্বাদে তিতা হলেও পুষ্টিগুণের দিক থেকে করলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি সবজি। নিয়মিত এটি খেলে শরীর নানা ধরনের উপকার পায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, তিতা স্বাদের খাবার পাকস্থলীতে গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিডের নিঃসরণ বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে পরবর্তী খাবারগুলো সহজে হজম হয়। অর্থাৎ আপনি যদি তিতা দিয়ে খাবার শুরু করেন, তাহলে মসলাযুক্ত বা ভারী খাবারও তুলনামূলক সহজে হজম হবে। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলেন, তেল-মসলাযুক্ত খাবারের আগে তিতা খাওয়া হজমের জন্য উপকারী।

করলার পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা

করলা শুধু হজমে সাহায্য করে না, বরং এটি নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, আয়রন, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত করলা খাওয়ার ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। ফলে সর্দি, কাশি বা মৌসুমি জ্বরের মতো ছোটখাটো অসুখ হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

এছাড়া করলা একটি প্রাকৃতিক রুচিবর্ধক হিসেবেও কাজ করে। যারা খেতে অনীহা বোধ করেন বা রুচি কম, তাদের জন্য করলা খুবই উপকারী।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলার ভূমিকা

করলার অন্যতম বড় উপকারিতা হলো এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এতে এমন কিছু প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে, যা ইনসুলিনের মতো কাজ করে এবং গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে।
যাদের ডায়াবেটিস আছে বা রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি, তারা যদি খাবারের শুরুতে করলা খান, তাহলে তা শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। যদিও এটি কোনো ওষুধের বিকল্প নয়, তবে খাদ্যাভ্যাসে করলা যুক্ত করা একটি ভালো সিদ্ধান্ত।

তিতা বাদ দিয়ে ভাজাভুজি খেলে কী হয়?

অনেকেই তিতা পছন্দ না করে খাবারের শুরুতে ভাজাপোড়া বা অন্য তেলযুক্ত খাবার খেয়ে থাকেন। কিন্তু এটি শরীরের জন্য ততটা ভালো নয়। তেল-চর্বিযুক্ত ভাজাভুজি খাবার হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং রক্তে শর্করার মাত্রাও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে শরীর ভারী লাগে এবং হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।

অন্যদিকে তিতা খাবার হজমের প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে এবং শরীরকে প্রস্তুত করে পরবর্তী খাবারের জন্য। তাই তিতা বাদ দিয়ে অন্য খাবার দিয়ে শুরু করলে সেই উপকারিতা পাওয়া যায় না।

তিতা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত

প্রথমে করলার তিতা স্বাদ অনেকের কাছে অপছন্দনীয় মনে হতে পারে। তবে ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হলে শরীর তার উপকারিতা অনুভব করতে শুরু করে।

একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য ছোট ছোট অভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের শুরুতে করলা খাওয়ার মতো একটি সহজ অভ্যাসই আপনার হজমশক্তি, রুচি এবং স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

করলা স্বাদে তিতা হলেও এর উপকারিতা অনেক বেশি। খাবারের শুরুতে সামান্য করলা খাওয়ার অভ্যাস হজমে সহায়তা করে, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

হঠাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে অস্থিরতা, নেপথ্যে কী?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ
হঠাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে অস্থিরতা, নেপথ্যে কী?

গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষ ও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শাহবাগ থানার ভেতরেও সংঘর্ষে জড়িয়েছে এই দুইটি ছাত্র সংগঠন।

এ সময় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন শিবির সমর্থিত ডাকসুর কয়েকজন নেতাও। ওই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকও।

এর মাত্র দুইদিন আগে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে একটি কলেজে শিবিরকে ইঙ্গিত করে একটি গ্রাফিতিতে ছাত্রদলের ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে এই দুইটি দলের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহতও হয়েছে।

এর বাইরেও গত কয়েকদিনে দেশের বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে নানা ইস্যুতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন পরে আবার অস্থির হয়ে উঠছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।

উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্পাস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করছে।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেছেন, মূলত ছাত্র শিবির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং নানা কৌশলে ক্যাম্পাসগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানোর কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

অবশ্যই এই অভিযোগ অস্বীকার করে শিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর ছাত্রদল এখন ক্যাম্পাসগুলোরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। যে কারণে তারা শিবিরের সাথে পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করার চেষ্টা করছে।

ক্যাম্পাসগুলোর এই পরিস্থিতি নিয়ে কথার লড়াই গড়িয়েছে জাতীয় সংসদেও। রোববার বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদে অভিযোগ করেছেন, ক্যাম্পাসগুলোতে আবারো গণরুম-গেষ্টরুম কালচার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, যে কারণে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে ক্যাম্পাসগুলো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকার আসার পর একদল আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে অন্যদল আধিপত্য ফিরে পেতে লড়াই করছে যে কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল ছাত্রলীগ। আবাসিক হলগুলোতে ‘গণরুম ও গেষ্টরুম কালচার’ প্রতিষ্ঠা করে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগও সামনে এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এতদিন গোপনে থাকা কমিটিও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। তখন জানা যায়, এতদিন ছাত্র শিবিরের অনেক নেতা-কর্মী ছাত্রলীগসহ অন্যান্য দলের ভেতরে গোপনে অবস্থান নিয়ে ছিলেন।

এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও শিবির সমর্থিত প্যানেল নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর ক্যাম্পাসগুলোতে অনেকটা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল ছাত্র শিবির।

গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পরও ক্যাম্পাসগুলোতে বড় কোন পরিবর্তন আসেনি ছাত্র রাজনীতির বলয়ে।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে একটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে মঙ্গলবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুইটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “নির্বাচনের পর সরকারে আসছে বিএনপি। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান দল ছাত্র শিবির। এখন শিবিরের বদলে ছাত্রদল প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে। এই নিয়ে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে কোথাও কোথাও”।

যদিও এই দাবি খারিজ করে দিয়েছে ছাত্রদল। সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলছেন, “তাহলে এটা স্পষ্ট যে পাঁচই অগাস্টের পর শিবির ক্যাম্পাসগুলো দখল করেছে, হলগুলোও দখলে রেখেছে, অথচ শিবির বলে তাদের হলে কার্যক্রম নেই, কমিটি নেই। যদি নাই থাকে তাহলে ছয়ই আগস্ট থেকে ক্যাম্পাস আর হলগুলো কারা দখল করলো। তারা সব কিছু দখলে রাখার পরও তারা সেটি স্বীকার করছে না”।

এই প্রশ্নে শিবিরের সেক্রেটারি সিগবাতুল্লাহ বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের পর ক্যাম্পাস ও হলগুলো থেকে যে গণরুম গেস্টরুম কালচার বিদায় করেছিল ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’ সেটি ফিরিয়ে আনতে চায় বলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

সাধারণ শিক্ষার্থী’র ধারণা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশে এর আগে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ বা সহযোগী ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাস ও হল দখল করার নানা অভিযোগ ছিল। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে থাকা সংগঠনেরও হল দখল করার উদাহরণ আছে।

তবে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার গঠন হলেও ক্যাম্পাসগুলোতে একটি আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেনি।

ছাত্রদলসহ কোন কোন ছাত্র সংগঠন আগে থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে ছাত্র শিবির। যে বিষয়টি কখনো প্রকাশ্যে আসছে না।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, “শুধু আবাসিক হল না, গত দেড় দুই বছরে আমরা দেখেছি ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতেও তারা সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে ঢুকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। যে কারণে সেই সংগঠনগুলোও নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না”।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসগুলোতে যেই ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ শব্দটা সামনে আসছে সেই সাধারণ শিক্ষার্থী নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান বলেন, “চব্বিশের পাঁচই অগাস্টের পর ক্যাম্পাসগুলো এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সেখানে ছাত্ররা চেয়েছে যে ক্যাম্পাসের “সাধারণ শিক্ষার্থীরা” কোন দলের ব্যানারে থাকবে না। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে সাধারণ এর সংজ্ঞা নিয়ে একটা প্রশ্ন উঠছে”।

“কেননা আমরা দেখেছি “সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের” ব্যানারে একটা দল প্রভাব খাটাতে শুরু করলো। সেখানে স্বাভাবিকভাবে সরকার গঠনের পর সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন এই জায়গাটাকে প্রশ্নের মধ্যে ফেলেছে। এই প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দেওয়াকে কেন্দ্র করেই ক্যাম্পাসগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা বা কিছুটা টানাপোড়েন শুরু হয়েছে”, যোগ করেন তিনি।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্র শিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, “ছাত্রদলের এমন অনেকে আছে তাদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে দশ বছর আগে, তাদের অনেকে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে হলগুলোতে থাকতে চায়। সেটাতে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’ বাধা দিলেই তারা ক্ষেপে যাচ্ছে। শিবিরের ওপর দায় চাপাচ্ছে”।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘বাগযুদ্ধ’

গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শাহবাগে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও শিবিরের কয়েকজন নেতা আহত হন। এই সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।

মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে একটি আপত্তিকর ফটোকার্ডকে কেন্দ্র করেই এই সংকট তৈরি হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিবিরের নেতাকর্মীদের মারাধর করে।

যদিও ফ্যাক্টচেকিংয়ে পরবর্তীতে সেই ফটোকার্ডটি ভুয়া প্রমাণিত হওয়ার পর দুইটি ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতারা আলোচনা করে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনে।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, “চব্বিশের পাঁচই অগাস্টের পরও তারা গুপ্ত অবস্থায় থেকে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখছে। বিভিন্ন আইডি ও পেজ থেকে বিএনপি ও ছাত্রদল নিয়ে নানা ধরণের প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, এই বিষয়গুলো ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কোথাও কোথাও তারা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইস্যু ছাড়াও সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিভিন্ন ইস্যুতে এই দুইটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে নানা নেতিবাচক প্রচারণার বিষয়গুলো সামনে আসছে।

ছাত্র শিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, “তারা যে মিথ্যা অভিযোগে হামলা করেছে সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইস্যুতে প্রমাণিত। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিকটিম হচ্ছি, আমরা সেটি নিয়ে মামলা করতে চাইলে অভিযোগ দিতে চাইলে থানা পুলিশও সরকারের ইশারায় সেটি গ্রহণ করছে না”।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষাঙ্গন শান্ত রাখতে এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও সরকারের এ নিয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “ছাত্র সংগঠনগুলো যতদিন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে থাকবে ততদিন এগুলো হতে থাকবে”।

সূত্র : বিবিসি বাংলা