খুঁজুন
, ,

ফরিদপুর-২ আসনে দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস, জটিল সমীকরণে ভোটের হিসাব

এহসানুল হক, ফরিদপুর ও মিজানুর রহমান বাবু, নগরকান্দা:
প্রকাশিত: বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:৫৩ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর-২ আসনে দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস, জটিল সমীকরণে ভোটের হিসাব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা) আসনে জমে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ। এ আসনে মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও স্থানীয় ভোটারদের বিশ্লেষণ বলছে, চূড়ান্ত লড়াই মূলত দুই প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। নির্বাচনী প্রচারণা, সংগঠনিক শক্তি ও ভোটের সম্ভাব্য সমীকরণ—সবকিছু মিলিয়ে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওয়ায়েদ ইসলাম রিংকু মাঠে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (১১ দলীয় জোট) মনোনীত রিকশা প্রতীকের প্রার্থী আল্লামা শাহ মো. আকরাম আলী ধলা হুজুর। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক কাঠামো, ব্যক্তিগত প্রভাব এবং ভোটের সম্ভাব্য স্থানান্তর—এসব বিবেচনায় এই দুই প্রার্থীর মধ্য থেকেই আগামী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

তবে কেবল এই দুই প্রার্থীই নন, আরও চারজন প্রার্থী রয়েছেন নির্বাচনী দৌড়ে। তারা হলেন—গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত ট্রাক প্রতীকের ফারুক ফকির, বাংলাদেশ কংগ্রেসের ডাব প্রতীকের মো. নাজমুল হাসান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের শাহ মো. জামাল উদ্দীন এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের আপেল প্রতীকের মো. আকরামুজ্জামান মিয়া। যদিও স্থানীয়ভাবে তাদের প্রচারণা তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং সাংগঠনিক উপস্থিতিও কম চোখে পড়ছে।

ভোটার ও কেন্দ্রের পরিসংখ্যান:

ফরিদপুর-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩২ হাজার ৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭২ হাজার ৯০৪ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৩৭ জন। আসনটিতে মোট ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রের সংখ্যা ১১৭টি। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

জটিল সমীকরণে ভোটের হিসাব:

স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক সচেতন মহলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে ভোটের সমীকরণ অত্যন্ত জটিল। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এই দুই দলই এ আসনে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় তাদের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ বিএনপিসহ বিভিন্ন দলে সক্রিয় হয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট কোনদিকে যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নগরকান্দা উপজেলার এক ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, “আওয়ামী লীগের ভোট এবার ছড়িয়ে যেতে পারে। কেউ বিএনপিতে গেছে, কেউ আবার নিরপেক্ষ আছে। শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।”

সালথা উপজেলার এক তরুণ ভোটার সুমাইয়া আক্তার বলেন, “আমরা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান চাই। শুধু দল নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও এবার বড় ফ্যাক্টর।”

ধর্মভিত্তিক ভোটের প্রভাব:

ফরিদপুর-২ আসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কওমি মাদরাসা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে আলেম-ওলামা ও ধর্মভিত্তিক ভোটারদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খেলাফত মজলিস প্রার্থীর পক্ষে ধর্মীয় নেতাদের একটি অংশ সক্রিয় রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে বিএনপিও স্থানীয় পর্যায়ে মসজিদ-মাদরাসা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করেছে।

নগরকান্দার এক মাদরাসা শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা চাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। প্রার্থীদের মধ্যে যারা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেবে, তাকেই সমর্থন দেব।”

প্রচারণায় কারা এগিয়ে?

মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে, বিএনপি প্রার্থী শামা ওয়ায়েদ ইসলাম রিংকু দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে নিয়মিত গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠক করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার প্রচারণা বেশ সক্রিয়। অন্যদিকে খেলাফত মজলিস প্রার্থী আকরাম আলী ধলা হুজুরও ধর্মীয় সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিকভাবে বিএনপি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও ধর্মভিত্তিক ভোটের একীভূত সমর্থন খেলাফত মজলিস প্রার্থীর পক্ষে গেলে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে।

সংঘর্ষের আশঙ্কা ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি:

স্থানীয়দের মধ্যে নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কাও রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে নগরকান্দা ও সালথা উপজেলায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। এবারও প্রচারণাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
সালথার এক প্রবীণ ভোটার হাবিবুর রহমান বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে চাই। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে।”

জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও মোবাইল টিম প্রস্তুত রাখা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি থাকবে।

শেষ মুহূর্তের কৌশল:

ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই জোরদার হচ্ছে কৌশল নির্ধারণ। প্রার্থীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমর্থন চেয়েছেন। স্থানীয় ইস্যু যেমন—রাস্তা সংস্কার, কৃষি সহায়তা, বেকারত্ব, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন—এসব বিষয় নিয়ে প্রতিশ্রুতির ঝড় তুলেছিলেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত কে জিতবেন তা নির্ভর করবে—আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটের গতিপথ, ধর্মভিত্তিক ভোটের সংহতি এবং নির্বাচনের দিন ভোটার উপস্থিতির উপর।

সব মিলিয়ে ফরিদপুর-২ আসনে এবারের নির্বাচন কেবল সংখ্যার লড়াই নয়, বরং কৌশল, জনপ্রিয়তা ও জোট রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ। এখন দেখার বিষয়, ৩ লাখের বেশি ভোটারের রায়ে কার কপালে জোটে সংসদ সদস্যের আসন।

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নতুন ভবনের করিডোরে প্রতিদিনের মতোই ধীর পায়ে হাঁটেন মো. জাকির হোসেন। কারও হাতে এক কাপ চা তুলে দেন, কারও জন্য দরজা খুলে দেন, আবার কখনো কোনো সাংবাদিকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দেন, চা খাওয়ান। সংবাদ শিরোনামে যাদের নাম উঠে আসে, তাদের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটির নাম খুব কম মানুষই জানেন। অথচ এই প্রেসক্লাবের প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি কক্ষ যেন তার জীবনেরই অংশ।

মো. জাকির হোসেনের জন্ম ১৯৭৯ সালের ২৯ মে, ফরিদপুর শহরের মধ্য আলীপুর মহল্লায়। বাবা শেখ আব্দুর রহমান ছিলেন একজন নাইটগার্ড। অল্প আয়ের সেই চাকরিতে সংসার চলত কষ্টে। মা ফাতেমা বেগম ছিলেন গৃহিণী। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেই বড় হয়েছেন জাকির। ফরিদপুরের বাখুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্য তার বই-খাতা কেড়ে নেয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে স্কুলের বেঞ্চ ছেড়ে জীবিকার পথে নামতে বাধ্য করে।

মাত্র দশ বছর বয়সে, ১৯৮৯ সালে, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তমিজউদ্দীন তাজের হাত ধরে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেই যে শুরু, তারপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন দশক। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, প্রেসক্লাবের ভবন বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি জাকিরের দায়িত্ববোধ।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য সাংবাদিকের উত্থান-পতন দেখেছেন। অনেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব নিতে দেখেছেন, আবার তাদের চিরবিদায়ও প্রত্যক্ষ করেছেন। সভাপতি সৈয়দ ইমামুল আজম আব্দুর রব, শেখ মো. দেলোয়ার হোসেন, জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, আব্দুল আলী শিকদার—আজ তারা আর নেই। সাধারণ সম্পাদক মন্টু দাস গোপী, ইউসুফ রেজা মন্টু, আ.জ.ম. আমীর আলী, আলী আশরাফ মো. শোয়াইব ও আরিফ ইসলামও চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আরও কত সদস্য, কত পরিচিত মুখ—এক এক করে হারিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি।

এসব কথা বলতে বলতে জাকিরের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। তিনি বলেন, “এই প্রেসক্লাবটাই আমার জীবন। এখানে আমার যৌবন কেটেছে, হাসি-কান্না কেটেছে। প্রতিটি দেয়ালে আমার স্মৃতি লেগে আছে।”

জাকিরের ব্যক্তিগত জীবনও সংগ্রামের গল্পে ভরা। স্ত্রী লিপি বেগম একজন গৃহিণী। অল্প আয়ে সংসার সামলাতে গিয়ে প্রতিটি দিনই তাদের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এক ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে। ছেলে আজিম হোসেন ২০২৪ সালে ফরিদপুরের সরকারি ইয়াছিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে জীবিকার তাগিদে হামিম গ্রুপের একটি গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছেন। মেয়ে মোসা. হাফছার বিয়ে হয়েছে কাপড় তৈরির মেশিনচালক আরিফের সঙ্গে। নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন জাকির।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর যেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোমরের হাড় ক্ষয়ের মতো জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। প্রতিদিন ওষুধ কিনতেই খরচ হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা। এই সামান্য টাকাও অনেক সময় জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসার আশায় মানুষের সহায়তায় ছয়-সাতবার ভারতে গিয়েছেন। কিছুদিন সুস্থ থাকলেও আবার ফিরে এসেছে অসুস্থতা। প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, কিন্তু অর্থের অভাবে সেই চিকিৎসা এখন অধরাই রয়ে গেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কখনো কারও দরজায় গিয়ে হাত পাতেননি। নিজের অভাবকে হাসিমুখে আড়াল করে প্রতিদিন যথাসময়ে কর্মস্থলে হাজির হন। যারা তাকে চেনেন, তারা জানেন—জাকিরের মুখে অভিযোগের চেয়ে কৃতজ্ঞতার কথাই বেশি শোনা যায়।

২০২৬ সালের মে মাসে মায়ের মৃত্যুর পর যেন আরও একা হয়ে গেছেন তিনি। সংসারের দায়িত্ব, ওষুধের খরচ, পুরোনো দেনা—সব মিলিয়ে জীবন যেন আরও ভারী হয়েছে। তবুও দায়িত্ব পালনে তার কোনো ক্লান্তি নেই। কেউ প্রেসক্লাবে এলে এখনও আগের মতোই আন্তরিক হাসিতে অভ্যর্থনা জানান তিনি।

জাকির হোসেন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। তিনি সংবাদপত্রের প্রথম পাতার মানুষও নন। কিন্তু সংবাদ তৈরির পেছনে যারা নিরলস শ্রম দিয়ে যান, তাদের একজন তিনি। সাংবাদিকদের ব্যস্ততার ভিড়ে হয়তো অনেকেই তাকে খেয়াল করেন না, কিন্তু প্রেসক্লাবের প্রতিটি দিন, প্রতিটি আয়োজন, প্রতিটি ব্যস্ত মুহূর্তে তার নীরব উপস্থিতি অপরিহার্য।

একটি প্রতিষ্ঠানে টানা প্রায় ৩৭ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা শুধু চাকরি নয়, এটি এক ধরনের ভালোবাসা, এক ধরনের আত্মনিবেদন। সেই ভালোবাসার মূল্য কি শুধু একটি সামান্য বেতন? একজন মানুষ, যিনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উৎসর্গ করেছেন, অসুস্থতার সময়ে কি তার পাশে দাঁড়ানো সমাজের দায়িত্ব নয়?

আজও জাকির হোসেনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন খুব সাধারণ—আরও একবার ভালো চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়ে বাঁচতে চান। তিনি বিলাসী জীবন চান না, বড় কোনো বাড়ি বা গাড়িও চান না। শুধু চান একটু স্বস্তিতে বেঁচে থাকার সুযোগ, যাতে প্রতিদিনের ওষুধের চিন্তা আর চিকিৎসার খরচের হিসাব তাকে তাড়া না করে।

হয়তো সমাজে এমন অনেক জাকির হোসেন আছেন, যারা নীরবে দায়িত্ব পালন করে যান, অথচ নিজেদের কষ্টের কথা কাউকে জানান না। তাদের গল্প খুব কমই আলোয় আসে। কিন্তু এমন মানুষেরাই আমাদের সমাজের নীরব ভিত্তি। তাদের ত্যাগ, সততা আর আত্মসম্মান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা পদবি বা সম্পদে নয়, বরং নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতায়।

জাকির হোসেন এখনও প্রতিদিন ফরিদপুর প্রেসক্লাবের দরজা খুলে দেন। হয়তো একদিন সেই দরজাই তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে। কিন্তু তার আগে, একজন সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এটাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব।

বিয়ের দুই মাস পর মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারাল সালথার শোয়াইব

নুরুল ইসলাম নাহিদ, সালথা:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:০০ পূর্বাহ্ণ
বিয়ের দুই মাস পর মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারাল সালথার শোয়াইব

নিজের অভাবী পরিবারকে স্বাবলম্বী করার জন্য বছর তিনেক আগে মালয়েশিয়ায় গিয়ে পাড়ি জমান মো. শোয়াইব বিশ্বাস (২৩) নামে এক যুবক। সেখানে গিয়ে দীর্ঘদিন একটি কোম্পানিতে কাজ করে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশে আসেন। দেশে এসে গত মাস দুয়েক আগে বিয়ে করেন।

তবে তার বিয়ের মেহেদীর রং শুকানোর আগেই জীবিকার তাগিদে ফের মালয়েশিয়ায় নিজের কর্মস্থলে গিয়ে চলে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- কর্মস্থলে কাজ করার সময় মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর।

নিহত শোয়াইব বিশ্বাস ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মুরুটিয়া গ্রামের মো. শওকত বিশ্বাসের ছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সেজো।

শনিবার (১০ জুলাই) সকালে শোয়াইবের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার ভগ্নিপতি মো. তুহিন হাসান। এদিকে শোয়াইয়ের খবরে শোকে স্তব্দ হয়েছে পরিবার। এমন অবস্থায় দেশে লাশ আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে চেয়েছেন সরকারের সহযোগিতা।

নিহতের পরিবার জানান, জীবিকার তাগিদে ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে একটি কম্পানিতে কাজ শুরু করেন শোয়াইব। সেখানে কাজ শেষে চলতি বছরের এপ্রিলে ছুটিতে বাড়িতে আসেন। বাড়ি আসার পর গত দুই মাস আগে বিয়ে করেন তিনি। এরপর ছুটি শেষে গত ১ জুলাই মালয়েশিয়া চলে যায়। দেশটির জহুরবারু এলাকায় একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অধীনে বোম্ব ক্রেনের সাহায্যে নির্মাণাধীন ভবনে ফায়ার ফাইটারের পাইপ লাগানোর কাজ শুরু করেন। শুক্রবার সকালে কাজ করাকালীন বোম্বক্রেন চাপায় নিহত হন তিনি।

নিহতের ভগ্নিপতি তুহিন হাসান বলেন, শুক্রবার দুপুরে মালয়েশিয়ার ওই কোম্পানির দায়িত্বরত এক বাংলাদেশী আমাকে ফোন করে নিহতের বিষয়টি জানান৷ তাছাড়া ওই বাংলাদেশী ছবি ও ভিডিও পাঠিয়েছে, তাতে নির্মমভাবে মৃত্যুর বিষয় ফুটে উঠেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে তার লাশ ফেরত পাঠানোর জন্য তিন সপ্তাহের সময় চেয়েছেন। তবে লাশটি দ্রুত দেশে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।

ফরিদপুর প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক মো. আশিক সিদ্দিকী বলেন, নিহত ব্যক্তি কোনো কোম্পানির অধীনে কাজ করে থাকলে তাঁরা দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে লাশ পাঠাতে পারবে৷ সেখান থেকে কোনো সহযোগিতার না পেলে নিহতের পরিবার আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বৈধ কর্মী হয়ে থাকলে আমরা লাশ আনার ক্ষেত্রে দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করব।

ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারের কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা, পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারি বরখাস্ত

পান্না বালা, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারের কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা, পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারি বরখাস্ত

ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) ষষ্ঠ শ্রেণির এক কিশোরী (১৪) ২৭ সপ্তাহের অধিক অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে ফরিদপুর কোতয়ালী থানায়। এ মামলার একমাত্র আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে দায়িত্বে অবহেলার জন্য শিশু পরিবারের পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারিকে বরখাস্ত করা হয়েছে।গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তির নাম মো. ওয়াহিদ শেখ (৫৪)। তিনি ওই শিশু পরিবার এলাকার একটি বাজারে দর্জির দোকানের মালিক।

এই ঘটনায় “দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে” ফরিদপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও শিশু নিবাসের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বাদী হয়ে গত ৬ জুলাই ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, কিশোরীটি শহরের টেপাখোলা এলাকার একটি স্কুলে পড়ে। শিশু পরিবার থেকে স্কুলে যাতায়াত করার সুবাদে গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে ওই এলাকার এক দর্জির দোকানের মালিক মো. ওয়াহিদ শেখ (৫৪) তাকে চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই ব্যক্তি তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে।

এর ফলে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে শারিরীক জটিলতার জন্য শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে গত ৬ জুলাই নেওয়া হয়। চিকিৎসক পরীক্ষার পর জানায় শিশুটি ২৭ সপ্তাহ ও দুই দিনের গর্ভাবস্থায় রয়েছে।

এ মামলার সূত্রে গত ৮ জুলাই পুলিশ সদর উপজেলার আদমপুর গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজ শেখের ছেলে ওয়াহিদ শেখকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
এদিকে দায়িত্ব অবহেলার দায়ে গত ৮ জুলাই সমাজসেবা অধিদপ্তরের পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস, মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার ও আয়া শামসুন্নাহার আক্তার ও তানিয়া তাজরীণ।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-সচিব ও পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ওই পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারিকে গত ৮ জুলাই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ এহিয়াতুজ্জামান বলেন, আদালতের নির্দেশে মেয়েটিকে সমাজসেবা বিভাগের অধীনে “নারী ও শিশু কিশোরী মহিলা হেফজতিদের আবাসন কেন্দ্র”- রাখা হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুর কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান জানান, মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।