খুঁজুন
, ,

গণতন্ত্রের উত্তরণে সামাজিক সংহতি ও জাতীয় দায়বদ্ধতা কেন জরুরি

মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ
গণতন্ত্রের উত্তরণে সামাজিক সংহতি ও জাতীয় দায়বদ্ধতা কেন জরুরি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে তপশিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তপশিল অনুসারে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫-এর আলোকে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এখন দেশব্যাপী চলছে নির্বাচনী হাওয়া। শহর, নগর, গ্রাম, পাড়া ও মহল্লায় চলছে এক এবং অভিন্ন আলোচনা।

নির্বাচনী মৌসুমে সব দলীয় প্রার্থী এবং জাতীয় নেতারা অতি সাধারণ বেশে জনতার কাতারে নেমে আসে। সাধারণ ভোটাররা প্রার্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে, বুক মিলিয়ে ও কুশল বিনিময়ে প্রশান্তি লাভ করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি দলনিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সরকার গঠন করে। তাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচিত সরকার গঠনের লক্ষ্যে ভোটার হিসেবে ভোট প্রদান নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব।

আধুনিক সমাজে রাষ্ট্র নাগরিকের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ। জনগণের এ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার বা প্রহসনমূলক পন্থায় নির্বাচিত সরকার অনেক সময় নাগরিক অধিকার হনন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, মানবাধিকার খর্ব করা, জনমত উপেক্ষা করা ও কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায়। এতে দেশে শান্তি, স্বস্তি, স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সংহতি বিঘ্নিত হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্ত গণতান্ত্রিক চর্চায় সফলতা কতটুকু? এখন মূল্যায়নের সময় এসেছে। গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন। যেখানে শাসন ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে। নাগরিকরা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অংশ নেয়, যা মূলত জনগণের ইচ্ছা ও মতামতের প্রতিফলন। যার মূলভিত্তি নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও সব নাগরিকের সমান অংশগ্রহণের সুযোগ। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশ অদ্যাবধি পূর্ণরূপে অর্জন করতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা, যা পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে ১৯৭৮ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে আবারও গণতন্ত্র প্রত্যাবর্তন করে। আশির দশকের গোড়ায় গণতন্ত্র আবারও হারিয়ে যায় এবং গড়ে ওঠে স্বৈরাচারী শাসন কাঠামো। ১৯৯০ সালের সালের ৬ ডিসেম্বর দেশে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে একটি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটে ছাত্র সংগঠনগুলোর দৃঢ়তায়। এ আন্দোলনে সাতদলীয় জোট, আটদলীয় জোট ও পাঁচদলীয় রাজনৈতিক জোটগুলো প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে এবং স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটায়। ১৯৯০ সালে সামরিক সরকারের পতন বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনাবিন্দু হিসেবে পরিচিত। আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী তিনদলীয় জোটের রূপরেখা অনুসারে নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হয় গণতন্ত্রের অভিযাত্রা এবং গণতন্ত্রের উত্তরণ। এ ধারাবাহিকতায় পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকে। পরে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ অনুষ্ঠিত দশম থেকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সর্বদলীয় ও সর্বসাধনের অংশগ্রহণ সীমিত করা হয়। দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হয়। উত্থান ঘটে স্বৈরতন্ত্রের।

জুলাই গণআন্দোলন দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূচনা করে, যা ছিল ২০২৪ সালে ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণতান্ত্রিক আন্দোলন। যার মাধ্যমে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন হয়। এ আন্দোলেনে তারুণ্যের শক্তির উদ্ভব ঘটে। তারা সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে কোটামুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে। অঙ্গীকারবদ্ধ হয় একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনে। জুলাই আন্দোলন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার আন্দোলন হিসেবেও বিবেচিত। এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্যগুলো—পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, মৌলিক মানবাধিকার ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, বৈষম্যহীন সমাজ, সুবিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

এখন সময় হয়েছে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সমাজের শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা মোটেই সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সামাজিক সংহতি। সামাজিক সংহতি হচ্ছে সমাজের সদস্যদের মধ্যকার মানসিক ঐক্য, পারস্পরিক সম্প্রীতি, বিশ্বাস ও বন্ধনের অনুভূতি, যা একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে ও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে শক্তি জোগায়। সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠায় সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজ অনন্য ভূমিকা পালন করে। সামাজিক সংহতি সমাজে শান্তি, সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা আনয়ন করে। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিশ্বাস বোঝাপড়া বাড়ায় ও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র হুমকির মুখে। বিশ্ব মুক্ত গণতন্ত্র চর্চায় ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে সীমিত মানুষের হাতে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তা অন্তহীন। সুইডেনভিত্তিক একটি সংস্থা ভি ডেম (ভ্যারাইটিস অব ডেমোক্রেসি) বিশ্বব্যাপী চলমান গণতন্ত্রায়ন ও স্বৈরতন্ত্রীকরণ নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে। এ জরিপের প্রকাশিত তথ্যমতে, বিশ্বের জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ স্বৈরতন্ত্রীকরণের শিকার। বর্তমানে পৃথিবীর ৮৭টি দেশে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র চালু আছে। ২০০৮ সালে উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা যেখানে ৪৪ ছিল, ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা ২৯টিতে নেমে আসে। জার্মানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’ বিশ্বের ১২৯ দেশে গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করে।

গণতন্ত্রের উত্তরণ ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন জাতীয় অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ রাষ্ট্র আমাদের, এ রাষ্ট্র সবার। এ রাষ্ট্র আমরা স্বাধীন করেছি সংগ্রামের মাধ্যমে। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে চাই স্থিতিশীল সমাজ, যা গণতন্ত্রের উত্তরণের মাধ্যমে সম্ভব। সামাজিক সংহতি সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় হোক।

লেখক: অধ্যক্ষ, জাতীয় সমাজসেবা একাডেমি, ঢাকা

 

টেকনাফে গুলিতে নিহত তিতাসের জানাজা সম্পন্ন, ফরিদপুরে নানীর কবরের পাশে দাফন

নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৫ অপরাহ্ণ
টেকনাফে গুলিতে নিহত তিতাসের জানাজা সম্পন্ন, ফরিদপুরে নানীর কবরের পাশে দাফন

‘কাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ মুঠোফোনে মাকে বলা ছেলের শেষ কথাগুলো এখন বারবার মনে পড়ছে রেখা বেগমের। অভিযানে যাওয়ার আগে মায়ের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ (২৮)। তবে সেই অভিযান থেকে আর ফেরা হয়নি তাঁর। 

কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত তিতাসের মরদেহ আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল ৪.৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ফরিদপুরের নগরকান্দায় আনা হয়। সন্ধ্যায় লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বাদ মাগরিব জানাজা শেষে গ্রামের স্থানীয় গোরস্থানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

তিতাসের মরদেহ বহনকারী সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারটি শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে নগরকান্দা সরকারি মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে অবতরণ করে। সেখানে পদ্মা সেনানিবাসের ১৫ আর-ই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের মেজর সোহেলের নেতৃত্বে সেনাসদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে। মরদেহ পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়িতে ভিড় করেন। এ সময় মা রেখা বেগম, বাবা আফজাল শেখ ও স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারসহ স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

শুক্রবার (০৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বাদ মাগরিব তিতাসের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে সেখানে উপস্থিত হয়ে নিহতের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ সময় তিতাসের ইউনিটের কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সাজিদসহ সেনাবাহিনীর সদস্য, পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।

জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় লস্করদিয়া স্থানীয় গোরস্থানে। সেখানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ক্যাপ্টেন সাজিদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তিতাসের কবরে সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এ সময় কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে সেনাসদস্যরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি আকাশের দিকে ছোড়েন। এভাবেই রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয় টেকনাফে দায়িত্ব পালনকালে নিহত এই সেনাসদস্য তিতাস শেখকে।

তিতাসের মৃত্যুর পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা রেখা বেগম। গত বুধবার রাতে মুঠোফোনে মাকে অভিযানে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিতাস। বলেছিলেন, ‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ ছেলের এমন কথায় দোয়া করেছিলেন মা। কিন্তু সেটিই যে তাঁদের শেষ কথা হবে, তা বুঝতে পারেননি তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে কান্নায় থামছে না তাঁর।

অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তিতাসের। তাঁদের সংসারে কোনো সন্তান এখনো আসেনি। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সেই অপেক্ষায় ছিলেন সুমাইয়া। কিন্তু ডিসেম্বর আসার আগেই স্বামীকে হারাতে হলো। আর সন্তান হারানোর শোকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা আফজাল শেখ।

তিতাসের পরিবারে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। বাবার পথ অনুসরণ করে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত। পরিবারের তিন সদস্যের সেনাবাহিনীতে যুক্ত থাকার মধ্যে তিতাসের এমন মৃত্যুতে স্বজনদের শোকের পাশাপাশি এলাকায়ও শোকের মাতম তৈরি হয়েছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি তিতাসের বুকের বাঁ পাশের ওপরের অংশে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিতাস সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য ছিলেন। তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁর মরদেহ রামু সিএমএইচে রাখা হয়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার হেলিকপ্টারে করে নিজ এলাকায় পাঠানো হয় তাঁকে।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার বিকেলে হেলিকপ্টারে করে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দায় পৌঁছায়। পরে গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় গোরস্থানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ
সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৮)। চার বছরের দাম্পত্য জীবনে একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর অদম্য স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে। কিন্তু সন্ত্রাসীদের একটি মাত্র বুলেট তাঁর সেই সাজানো স্বপ্নের দুনিয়া নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে ঠিকই ফিরছেন তিতাস, তবে তা কোনো আনন্দ নিয়ে নয়—বরং একটি নিথর, প্রাণহীন মরদেহে।

​প্রিয় স্বজনের এমন নির্মম বিদায়ের অপেক্ষায় থাকা তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগমের আহাজারিতে লস্করদিয়ার আকাশ-বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠেছে।

​শেষ মায়ের দোয়া ও মর্মান্তিক পরিণতি

​স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে শেষবারের মতো কথা হয় তিতাসের। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশ নিতে হবে জানিয়ে তিনি মায়ের কাছে দোয়া চান। কে জানত, এটাই হবে মায়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ কথোপকথন! বৃহস্পতিবার রাতেই তিতাসের মৃত্যুর সংবাদ এসে সব ওলটপালট করে দেয়।

​নিহত তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল শেখের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। সেনাপরিবারের সন্তান তিতাসের বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তিতাস ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।

​স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগম। পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং তিতাসের এমন করুণ মৃত্যু যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসীও।

​রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শোক প্রকাশ

​সেনা সদস্য তিতাস শেখের এই মর্মান্তিক ও অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

​এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিতাস শেখ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর এই মহান আত্মত্যাগ জাতি সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

​প্রতিমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশসেবায় নিয়োজিত থেকে সেনা সদস্য তিতাসের এই আত্মত্যাগ অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও তাঁর সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশবাসীর হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে পদ্মা নদীর মধ্যে নির্মিত ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করেছে উপজেলা প্রশাসন।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ অভিযান চালিয়ে এসব বাঁধ উচ্ছেদ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীর চর শালিপুর ও সিট মির্জাপুরের খাঁ এলাকার পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এতে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ জেলেরা মাছ শিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে পদ্মা নদীতে এই অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করে আসছিলো। এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী জেলেরা অবৈধ বাঁধ অপসারণের দাবিতে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম খাঁন বাবুলের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুলহাস হোসেন সৌরভকে তদন্ত করে এই অবৈধ বাঁধের বিষয় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত উচ্ছেদ করার নির্দেশ দেন। সংসদ সদস্যের নির্দেশনার পর আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় জেলেরা।

স্থানীয় জেলেরা বলেন, ভবিষ্যতে যেন কেউ আবার পদ্মা নদীতে অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে মাছের অবাধ বিচরণ ও সাধারণ জেলেদের জীবিকার পথে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, প্রবাহমান জলাশয়ে আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়া মৎস্য আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব বাঁধ মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও চলাচল ব্যাহত করার পাশাপাশি জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। বাঁধ উচ্ছেদে জব্দকৃত সকল অবৈধ কারেন্ট জাল এবং চায়না দুয়ারী নদীর পারে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
নদী ও জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।